তিতাসের স্রোতে অদ্বৈতের স্মরণ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিনব্যাপী কবি সম্মিলন

লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

৬ডিসেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেন একদিনের জন্য হয়ে উঠেছিল কবি–সাহিত্যিকদের প্রাণকেন্দ্র। অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে শনিবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “অদ্বৈত কবি সম্মিলন”—যা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং তিতাসপাড়ার সাহিত্য–ঐতিহ্যকে নতুন করে চিনে নেওয়ার উপলক্ষও।

দিনের প্রথম আলোয় মুখরিত হয়ে ওঠা আয়োজনটির উদ্বোধন করেন দেশবরেণ্য কবি আসাদ মান্নান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মিজ শারমিন আক্তার জাহান। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কবি ও প্রাবন্ধিক . শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক

স্বাগত বক্তব্যে গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কবি এড. হুমায়ন কবির ভুইয়া জানান—অদ্বৈতকে স্মরণ করা মানে আসলে বাংলার জলজ জীবনের, নদীমাতৃক সমাজের এবং প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামী আত্মার প্রতি সম্মান জানানো।

উদ্বোধনের পর সকাল ১১টায় শুরু হয় বহুল প্রত্যাশিত ‘কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ’। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবিরা অংশ নেন এই পর্বে। কারও কণ্ঠে উঠে এসেছে নদীর প্রাচীন স্মৃতি, কারও কবিতায় ছিল মানববেদনার অন্তর্লিখন, আবার কেউ কেউ অদ্বৈতের সাহিত্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেদের অনুভূতি মেলে ধরেছেন।

পুরো প্রাঙ্গণে তখন এক ধরনের নীরব আবেশ—যেন তিতাস নদী নিজেই কবিতার স্রোতে বইতে শুরু করেছে।

বিকাল পাঁচটায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ মুক্তমঞ্চে শুরু হয় দিনশেষের সাংস্কৃতিক আয়োজন। তিতাসের সেই মালোপাড়ার অদ্বৈত বংশধরদের পরিবেশনায় গান ও নৃত্য যেন নতুন করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার শৈশবের সেই গ্রাম—গোর্কণঘাটে।

তাদের গানে বাজে নদীর টান, জেলের নৌকা, মাছধরার কৌশল, উপার্জনের টানাপোড়েন—যে বাস্তবতা অদ্বৈত তার লেখায় এত নিপুণভাবে তুলে ধরেছিলেন। “তিতাস একটি নদীর নাম”-এর চরিত্ররা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই মঞ্চে।

অদ্বৈত

অদ্বৈত মল্লবর্মণ কেবল একজন কথাসাহিত্যিক নন; তিনি নদীভিত্তিক সমাজকে কেন্দ্র করে তৈরি করেছেন একটি প্রত্যুৎপন্ন সাহিত্যজগৎ। অসহায়, অবহেলিত মালো-মজুরদের জীবন, তাদের স্বপ্ন আর বেদনার কথা তুলে ধরে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যকে দিয়েছেন নতুন দিগন্ত।

তার উপন্যাস “তিতাসএকটিনদীরনাম” শুধু এক সাহিত্যকর্ম নয়—এটি নদী, মানুষ এবং সমাজের মধ্যকার সম্পর্কের এক গভীর সমাজ-স্মৃতি। তিতাসপাড়ার মানুষের মৃত্যু–জন্ম, উত্থান–পতন, সংগ্রাম–মমতা—সবকিছু মিশে গেছে সেই গল্পে।

এই কারণেই আজও অদ্বৈতের স্মরণ মানে সামাজিক ইতিহাসের স্মরণ; মানে প্রান্তিক মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

দিনব্যাপী এই আয়োজন শুধু সাহিত্যসন্ধ্যার পরম্পরা নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি দৃষ্টান্ত। সংগঠকদের প্রত্যাশা—আগামী দিনে অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্য গবেষণা, তার জীবন ও নদীমাতৃক সমাজের ওপর আরও বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

অদ্বেত ২

অদ্বৈতকে কেন্দ্র করে গবেষণা, শিশু-কিশোরদের জন্য সাহিত্য কর্মশালা, নদী–সংস্কৃতি বিষয়ক নাটক, পাঠচক্র, সেমিনার—এসবই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্যজগতকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

তিতাসের তীরে দাঁড়িয়ে যেভাবে জীবন জন্ম নেয়, বিলীন হয়, আবার ফিরে আসে—তেমনি অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্যও সময় ও সমাজের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে এক চিরন্তন স্রোতধারা হয়ে।

৬ ডিসেম্বরের এই কবি সম্মিলন সেই স্রোতকে আরও বিস্তৃত করেছে—আরও জীবন্ত করেছে—আরও অর্থবহ করেছে।