প্রবাসজীবনের অর্জন দিয়ে কুমিল্লায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন মোশাররফ

IMG-20260924-WA0000
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

চট্টগ্রাম বিশেষ প্রতিনিধি : আহমদ রেজা : একজন মানুষের জীবনের সাফল্য সাধারণত অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। তবে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকাহিনি কিছুটা ভিন্ন। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন শিক্ষা ও মানবকল্যাণে। নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও অন্যদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন তিনি। তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে বর্তমানে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরীর ঘরে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৭৪ সালে বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব ও বাস্তবতার সঙ্গে অল্প বয়সেই পরিচিত হতে হয় তাকে।
১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে কাতারে পাড়ি জমান মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তাকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ট্যাক্সিক্যাব চালানো, ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করা এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে শ্রম দেওয়ার মতো কাজও করেছেন তিনি। কিন্তু প্রবাসে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য কিছু করার চিন্তাও ধরে রাখেন।
১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ধান্যদৌল গ্রামে বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরির এ উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে তার শিক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করে।
১৯৯৪ সালে মা ও দাদির নামে প্রতিষ্ঠা করেন আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। এরপর ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে বর্তমানে ১০টি বিষয়ে অনার্স পড়ানো হয় এবং প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
একই বছরে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুমু রোহান কিন্ডারগার্টেন, যেখানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণেও সহযোগিতা করেছেন মোশাররফ হোসেন। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে এক বিঘা জমি দান করেন তিনি। এছাড়া অসচ্ছল মানুষের সহযোগিতা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তার সহযোগিতার কথা স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তার জনহিতকর কর্মকাণ্ডের একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হলো একটি প্রাচীন বটগাছ সংরক্ষণ। ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরের পাশে থাকা বিশাল বটগাছটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি এক লাখ টাকা দিয়ে গাছটির স্বত্ব গ্রহণ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মন্দির ও গ্রামের স্কুলের নামে সেই স্বত্ব দিয়ে দেন তিনি। গাছটি যতদিন প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকবে, ততদিন সংরক্ষিত রাখার পরিকল্পনাও করা হয়।
মোশাররফ হোসেনের শিক্ষানুরাগের পেছনে পারিবারিক ঐতিহ্যও রয়েছে। তার পরিবারের পূর্ববর্তী প্রজন্মের সদস্যরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার দাদা সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে ধান্যদৌল গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তার বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ১৯৫৭ সালে রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রবাসজীবনে কঠোর পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ নিজ এলাকার শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করার মাধ্যমে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের জীবনের অপূর্ণ শিক্ষার স্বপ্নকে তিনি অন্যদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।
তার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষা। ভবিষ্যতেও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষে আজ যে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তাদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির পেছনে রয়েছে একজন প্রবাসীর দীর্ঘদিনের শ্রম, ত্যাগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গল্প।
অর্থ-সম্পদের পরিবর্তে শিক্ষা ও মানবকল্যাণে বিনিয়োগের এই ধারাবাহিকতার কারণে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন কেবল একজন প্রবাসীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষাবিস্তার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী অবদান রাখার গল্প।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ০

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার ↗ PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ ↗ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী ↗ PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ ↗