গ্রাম বাংলার হাজার বছরের ঐহিত্য মানুষের পানের জন্য সুপেয় পানির একমাত্র উৎস ছিল ইঁন্দিরা বা কুয়া।
কুয়া থেকে পানি তোলার কথা এখন ভাবতেই পারে না মানুষ। আধুনিক সময়ে বালতিতে দড়ি বেঁধে কুয়া থেকে এত পরিশ্রম করে কে পানি তোলে!
কিন্তু একসময় কুয়ার পানিতেই মিটেছে তৃষ্ণা, সারতে হয়েছে গৃহস্থালি কাজ।
গ্রীষ্মের খরতাপে পুকুর-খাল-বিল যখন শুকিয়ে যেত, তখন কুয়া হয়ে উঠত পানির একমাত্র উৎস।
আগে গ্রামে হরহামেশা কুয়া চোখে পড়ত। এটি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
তারপরেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার উজানচর ইউপি’র রাধানগর গ্রামে টিকে আছে প্রায় ৩’শ বছরের পুরনো এক কুয়া, যার কদর আজও কমেনি।
৪-৫ হাত গোল কমপক্ষে ৬০-৭০ ফুট নিচ পর্যন্ত ২৫-৩০ জন মাটি খুড়ে দীর্ঘ ৩ মাস ব্যয় করে ইন্দিরাটি (কুয়া) তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যার নিচে চতুর্দিকে ইট দিয়ে প্লাস্টার করা। যা আজও গ্রামের শতাধিক মানুষ ব্যবহার করছে।
কারণ এর পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে সম্পূর্ণ আর্সেনিক ও আয়রন মুক্ত। যার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ।
এলাকার লোকজনের সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর জন্য এটি ৩’শ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানান কুয়াটির ওয়ারিশান সূত্রে মালিক শামসুল আলম বাবু (৪২)।
তিনি কালেরকন্ঠকে বলেন, “আমার পিতা আব্দুল কাদির, দাদা মৌলভী চান মিয়া চেয়ারম্যান, তার পিতা নোয়াব আলী প্রধান। নোয়াব আলী প্রধানের পিতামহ প্রায় ২৫০ থেকে ৩’শ বছর আগে নির্মাণ করেছিলেন।”
প্রবীন বৃদ্ধ আসগর মিয়া (৯০) বলেন, “আমি বাল্যকাল থেকে ইন্দিরাটি দেখছি।”
আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহ্যের কুয়া বা ইন্দিরা।
পর্যায়ক্রমে মানুষ শিক্ষিত ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে নলকূপ বা মেশিন বসিয়ে মাটির গভীর থেকে পানি উত্তোলন করে এখন চাহিদা মেটাচ্ছে।
শিক্ষাবিদ সেলিম মাষ্টার বলেন,
‘নব্বইর দশক পর্যন্ত অনেক এলাকার মানুষ তাদের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করতো গভীরকূপ বা ইঁদারা থেকে।
এসব কুয়া বা ইঁদারার পানি হতো স্বচ্ছ ও ঠান্ডা।
সুপেয় পানি পানের অভাব বোধ থেকেই মানুষ খনন করতো গভীর কুয়া।
খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর থেকে সংগৃহীত পানি দিয়ে ঘর-গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় কাজ করতো।
গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুয়াগুলো কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। যা এখন শুধুই স্মৃতি।
কিছুদিন আগেও যে বাড়িতে কুয়া বা ইঁদারা ছিল সেই বাড়িতে এখন রয়েছে নলকূপ।
আবার অনেক বাড়িতে ইলেকট্রিক মোটর দিয়ে পানি উত্তোলন করা হয়।’
সদর ইউপি’র রাধানগর গ্রামের জামাল মিয়া বলেন, “আমি ছুডু বেলা (বাল্যকাল) থাইক্কাই এই ইন্দিরাটি দেখতাছি। এইডার পানি শীত-গরমের সময় খুব বালা থাহে (থাকে)।”
স্থানীয় মোহাম্মাদ মিয়া (২৮) কালের কন্ঠকে জানান,
‘প্রায় ৩’শ বছর আগে কুয়াটি খনন করা হয়েছিল।
গরমের সময় খাবার ও গোসলের জন্য খুবই স্বস্তি দায়ক কুয়ার পানি।
কুয়ার পানি দিয়ে গোসল করলে খুবই আরাম পাওয়া যায়।
পানি খুবই ঠান্ডা থাকে। তাছাড়া কুয়ার পানি পানের জন্য নিরাপদ।
স্বচ্ছ ঝকঝকে টলমল পানি। মুখ ডাকা থাকলে পানি পরিস্কার থাকে।’

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।