
রাবেয়া জাহান তিন্নি: বর্তমান যুগে শিশুদের নিযে অভিভাবকদের মধ্যে যে অসুস্থ প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে তাতে শিশুরাই অসুস্থ হযে যাচেছ। পৃথিবীতে সব অভিভাবকেরাই সন্তানের কল্যান চাই। তবে কেন সব সন্তানদের কল্যাণ সাধিত হয় না।সন্তান বিপথগামী হওয়ার পেছনে ভাগ্য বা পরিবেশ যতটা দায়ী ;তার চেয়ে অনেক বেশী দায়ী বাবা–-মা।বিশেষ করে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অতিরিক্ত নেতিবাচক আচরন সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে অনেকাংশে দুর্বল করে দেয়।
অধিকাংশ বাবা মায়েরা পাঠ্যপুস্তক পড়ার প্রতি সন্তানদের উপর অনেক জোর প্রয়োগ করে। আর জোর করে কোনো কিছু পড়ানো হলে তাতে হয়ত শেখা যায়; তবে অর্জিত হয়না কিছুই। আর যে জ্ঞান অর্জিত না হয় তা জীবনে কোনো কাজে লাগে না।সব ছেলে-মেযেরা একই বিষযে পারদর্শী হয় না। তাই আরে ক’জনের ছেলে ডাক্তার হয়েছে বলে নিজের ছেলেকেও ডাক্তার বানাতে হবে, আর তার জন্য সন্তানের উপর চাপ প্রয়োগ করা কোনো ভাবেই উচিত নয়। বাবা মায়ের সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন থাকতে পারে; তবে একথা কোনো ভাবেই ভুলা যাবে না যে সন্তান একটি আলাদা মানুষ। তার আলাদা চিন্তা-চেতনা রয়েছে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন গুলো সন্তানের উপর চাপানো যাবে না। যে ছেলের ডাক্তার হওয়ার যোগ্যতা নেই, তার মধ্যে হয়ত এমন কিছু যোগ্যতা আছে যার বলে সে অনেক বেশী সফল হতে পারে। বাবা মায়ের কাজ হচেছ সন্তানের ঐ যোগ্যতা কে শাণিত করা। আর নিজের ভাল লাগা কাজের উপর যখন বাবা-মায়ের সমর্থন এবং সহযোগীতা থাকে তখন আসলেই জগতের অসাধ্য জয় করা যায়।
আত্ম মর্যাদার শিক্ষা শুরু হয় শৈশব থেকেই। শিশুদের আত্ম সম্মানে আঘাত লাগে এমন আচরন তাদের সাথে করা উচিত নয়। সন্তানের প্রকৃতি অনুযায়ী তাকে এমন ভাবে শাসন করতে হবে যাতে কোনো ভাবেই তার আত্মসম্মানে আঘাত না আসে। এবিষয়ে আমাদের অনেক অভিভাবকরাই সচেতন নন। অনেক সময় দেখা যায় বাবা-মায়েরা সবার সামনে ছেলে-মেয়েদের কে নির্বিচারে বকাঝকা করতে থাকে।
সন্তান-সন্ততি বাবা-মার অংশ হলেও তার নিজস্ব একটা স্বকীয়তা আছে। আর ঐ স্বকীয় তাকে ক্ষুন্ন করা হলে একটি শিশুর মেরুদন্ডকেই ক্ষুন্ন করে দেওয়া হয়। শিশুদের মধ্যে অনেক কৌতহল থাকে। তাদেরে এই কৌতুহুলী মন কে কোনো ভাবেই নিরুৎসাহিত করা যাবে না; বরং তাদের কৌতুহল নিবারনের সকল সুযোগ করে দিতে হবে। একেক শিশু একেক বিষয়ে পারদর্শী থাকে।শিশুদেরকে তাদের ভাল লাগাও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করতে দিতে হবে। শিশুরা অন্যায় করলে তাদের সাথে হিংস্রাত্মক আচরন করা যাবে না। অনেক সময় রাগের বশবর্তী হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মায়েরা সন্তানের এমন কিছু জায়গায আঘাত করে যেখানে তাদের জীবনের চরম ক্ষতি হয়ে যায়। মানুষের বাম মস্তিষ্কে আঘাত করলে বিশেষ করে শৈশব কালে কেউ আঘাত প্রাপ্ত হলে তার বৌদ্ধিক ক্রিয়া অনেকাংশে দূর্বল হয়ে যায়।
ভবিষ্যৎত জীবনের লক্ষ্য নির্ধারনে সন্তানের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কোনো ভাবেই সন্তানের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া উচিত না। কারন স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। সন্তানের ইচছা-অনিচ্ছাকে গুরত্ব দিলে বাবা-মায়ের প্রতিশ্রদ্ধা- ভক্তি স্বাভাবিক ভাবেই চলে আসবে। কারন শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা জোর করে আদায় করা যায় না। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান দুরে সরে যাওয়ার প্রধান কারন থাকে তাদের উপর জোর প্রয়োগ করা, তাদের স্বাধীনতায় অযৌক্তিক ভাবে হস্তক্ষেপ করা। আবার সন্তানের প্রতি অন্ধ ভালবাসা তাদের কে অনেক সময় বিপথ গামী করে।
বাবা মায়েরা নিঃস্বার্থ ভাবে সন্তানের উন্নতি চায়; আর সেই উন্নতির পথ তখনই সুগম হবে যখন তাদেরকে আচলে বেধে না রেখে তাদের চিন্তার দ্বার মুক্ত হস্তে খুলে দেওয়া হবে। ভাল-মন্দের শিক্ষা শৈশব থেকে তাদের মধ্যে এমন দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে জগতের কোনো প্রলোভন তাদের কে স্পর্শ করতে না পারে।
লেখক: রাবেয়া জাহান,সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ
