‎ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতিসন্তান ড. আকবর আলি খান ‎মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সংগঠক থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ আমলা ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ

15250
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কৃতিসন্তান ড. আকবর আলি খান ছিলেন বাংলাদেশের প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। সরকারি আমলা, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক—বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি দেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

‎১৯৪৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন ড. আকবর আলি খান। বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদসূত্রে তাঁর জন্মস্থান নবীনগর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; স্থানীয়ভাবে রসুল্লাবাদ গ্রামের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক শিকড়ের কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়।

‎শিক্ষাজীবনে তিনি ইতিহাস বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি ও পিএইচডি অর্জন করেন।

‎মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা

‎১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আকবর আলি খান ছিলেন হবিগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও)। পাকিস্তানি শাসনের প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের পক্ষে অবস্থান নেন। পরে তিনি মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজ করেন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

‎মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকার কারণে পাকিস্তানি সামরিক আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার করে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান যে কতটা দৃঢ় ছিল, এই ঘটনাই তার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখিত।

‎রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে

‎স্বাধীনতার পর তিনি আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অর্থসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

‎২০০১ সালে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং অবসর-পরবর্তী সময়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন।

‎তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

‎২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আকবর আলি খান। তিনি অর্থ, পরিকল্পনা ও বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে তিনিও পদত্যাগ করেন।

‎এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি Regulatory Reforms Commission-এর প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‎লেখক ও মননশীল বুদ্ধিজীবী

‎আকবর আলি খান শুধু প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা অর্থনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মননশীল লেখক ও গবেষক। অর্থনীতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে তাঁর লেখা পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’, ‘বাংলাদেশে ইসলামের আগমন’, ‘চাবিকাঠির খোঁজে’, ‘অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ এবং আত্মজীবনীমূলক **‘পুরানো সেই দিনের কথা’**সহ আরও বেশ কিছু বই।

‎তাঁর লেখায় যেমন ছিল অর্থনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার বিশ্লেষণ, তেমনি ছিল ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের জীবন নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ।

‎চলে গেলেন, রেখে গেলেন স্মৃতি ও জ্ঞানের ভাণ্ডার

‎২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকায় অসুস্থ হয়ে ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ড. আকবর আলি খান। পরে তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

‎একটি ছোট্ট জনপদ নবীনগর থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা, অর্থনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে অবদান রাখা এবং লেখালেখির মাধ্যমে জাতির চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করা—ড. আকবর আলি খানের জীবন তাই এক অনন্য কর্মময় অধ্যায়।

‎ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই কৃতিসন্তান আজ শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম, মেধা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অঙ্গীকার এবং জ্ঞানভিত্তিক চিন্তার উত্তরাধিকার বাংলাদেশের ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ