‎মোহ নয়, মানুষের জন্য জীবন: ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রিন্সিপাল শেখ মো. আবু হামেদ ‎

15232
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্যই ছিল তাঁর জীবন। রাষ্ট্রের বড় বড় পদ কিংবা রাজধানীর স্বচ্ছল জীবন তাঁকে কখনো টানতে পারেনি। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গ্রামকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের পাশে থেকে গেছেন মরহুম প্রিন্সিপাল শেখ মো. আবু হামেদ  একজন ভাষা সংগ্রামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

‎১৯৫১-৫২ সালে ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন শেখ মো. আবু হামেদ। সেই সময়ের মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ হিসেবে তাঁর সামনে ছিল রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু শহরের চাকচিক্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহ তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি।

‎পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তিনি যদি ঢাকায় থেকে যেতেন, হয়তো আজ তাঁদের পরিবারের গল্পটি অন্যরকম হতে পারত। ধানমণ্ডিতে একাধিক বাড়ি থাকতে পারত, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদেও তিনি অধিষ্ঠিত হতে পারতেন। উপাচার্য, মন্ত্রী, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও যাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর সামনে ছিল এমনটাই মনে করেন তাঁর স্বজনরা। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন এক পথ নিজ গ্রাম, নিজের মানুষ এবং শিক্ষাবঞ্চিত প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানোর পথ।

‎সরাইল সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। শুধু একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি; এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়ার দিকে শিক্ষকতা, সংগঠন ও নেতৃত্বের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

‎একটি অনগ্রসর জনপদে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে তাঁর অবদান আজও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। তাঁর উদ্যোগ ও শ্রমে বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, বহু পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছেছে।

‎তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; শিক্ষা ছিল মানুষ গড়ার শক্তি। তাই নিজের জীবনের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তিনি শিক্ষার বিস্তারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

‎শেখ মো. আবু হামেদের জীবন কেবল একজন শিক্ষাবিদের জীবন নয়। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ছিলেন একজন ভাষা সংগ্রামী।

‎১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

‎একজন শিক্ষাবিদ, ভাষা সংগ্রামী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর জীবন তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জনপদের সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর জীবন ও কর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

‎সন্তানের স্মৃতিতে বাবার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সম্পদ নয়, তাঁর সততা ও মানুষের জন্য করা কাজ।

‎স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর সন্তান বলেন, বাবার কারণে তাঁদের শৈশব হয়তো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। কিন্তু সেই অভাব কখনো বাবাকে নিয়ে তাঁদের গর্বকে ম্লান করতে পারেনি।

‎তাঁর ভাষায়, “অন্তত কেউ বলতে পারবে না—তোমার আব্বা মানুষের ক্ষতি করে গেছেন। নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মানুষের সেবা করে গেছেন তিনি।”

‎এই একটি কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের ক্ষতি না করে, নিজের সামর্থ্য ও জীবনকে অন্যের কল্যাণে উৎসর্গ করে যাওয়া।

‎একজন সন্তানের কাছে বাবার স্মৃতি শুধু বড় কোনো পদ বা কৃতিত্বের গল্প নয়; কখনো কখনো সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে থাকে ছোট্ট কোনো শৈশবস্মৃতি।

‎সেই স্মৃতির পাতায় এখনও অমলিন হয়ে আছে বাবার বুকে ঘুমিয়ে থাকার একটি মুহূর্ত।

‎সন্তানের স্মৃতিতে, ১৯৮৭, ১৯৮৮ কিংবা ১৯৮৯ সালের কোনো একদিন সম্ভবত ভয়াবহ শিলাবৃষ্টির সময় শেষবারের মতো বাবার বুকে ঘুমিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার কথাও তাঁর মনে আছে। তবে সুনির্দিষ্ট বছরটি আজ আর নিশ্চিতভাবে মনে নেই। কিন্তু বছরটি যাই হোক, বাবার বুকের সেই আশ্রয়ের স্মৃতি সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও তাঁর হৃদয়ে অমলিন।

‎একদিকে ইতিহাসের পাতায় ভাষা সংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা; অন্যদিকে সন্তানের কাছে তিনি সেই মানুষটি যাঁর বুকে মাথা রেখে শৈশবের নিরাপত্তা অনুভব করা যেত।

‎জীবনে বড় হওয়ার অসংখ্য সুযোগ পেয়েও শেখ মো. আবু হামেদ ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ বেছে নেননি। তিনি রাজধানীর জীবন ছেড়ে গ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন, মানুষের পাশে থাকার পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়াকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য করেছিলেন।

‎তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো কোনো বাড়ি, পদ-পদবি কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন একটি জনপদের বহু মানুষের জীবনে শিক্ষা ও মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে যাওয়া।

‎আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার পথ, তাঁর কর্ম, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং তাঁর দ্বারা উপকৃত মানুষের জীবনেই যেন বেঁচে আছেন তিনি।

‎মরহুম প্রিন্সিপাল শেখ মো. আবু হামেদের জীবন তাই শুধু একটি পরিবারের গর্বের ইতিহাস নয়; এটি একটি জনপদে শিক্ষা, দেশপ্রেম, ত্যাগ ও মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক অনন্য গল্প।



Theoretical Basis fb: Sheikh adnan fahad 

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ