লাগাতার তিন জুমা না পড়লে যা ঘটে — কুরআন ও হাদীসের আলোকে ভয়াবহ পরিণতি

সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

লাগাতার তিন জুমা না পড়লে যা ঘটে — কুরআন ও হাদীসের আলোকে ভয়াবহ পরিণতি

 

আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর ইবাদতের জন্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য। (সুরা আদ-যারিয়াত: ৫৬)

 

 

ইবাদতের শ্রেষ্ঠ রূপ হলো নামাজ (সালাত)। কেননা রাসূল ﷺ বলেন, নামাজ হলো দ্বীনের স্তম্ভ। (তিরমিজি: ২৬১৬)

 

 

অর্থাৎ নামাজ ছাড়া ইসলামের ভিত্তি অটল থাকতে পারে না। হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নবী করিম ﷺ বলেন, কিয়ামতের দিন বান্দার প্রথম হিসাব নেওয়া হবে নামাজ থেকে। যদি নামাজ ঠিক থাকে, তবে তার বাকি আমলও ঠিক থাকবে; আর যদি নামাজ নষ্ট হয়, তবে বাকি আমলও নষ্ট হবে। (তিরমিজি: ৪১৩, সহিহ)

 

 

নামাজের মর্যাদা ও সমাজিক প্রভাব :

 

নামাজ জান্নাতের চাবিকাঠি। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের একত্রিত হওয়া সমাজে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার বন্ধন গড়ে তোলে। ধনী-গরিব, উচ্চ-নিম্ন সকলেই এক কাতারে দাঁড়ায়—এভাবেই নববী সমাজের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 

সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম কর, এবং ফজরের নামাজও কায়েম কর। নিশ্চয়ই ফজরের নামাজে উপস্থিতি হয়। (সুরা বনি ইসরাঈল: ৭৮)

 

নামাজের মধ্যে জুমার নামাজ অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব বহন করে। যার ফলে জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

 

জুমার নামাজের মর্যাদা

 

রাসূল ﷺ বলেন, জুমার দিন হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠ দিন, যেদিন সূর্য উদিত হয়। এদিন আদম (আ.) সৃষ্টি হয়েছেন, এদিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এদিনই তাঁকে সেখান থেকে বের করা হয়েছে, আর কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিন। (মুসলিম: ৮৫৪)

 

 

জুমার নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে নবীজি ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিনে গোসল করে এবং প্রথম প্রহরে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; দ্বিতীয় প্রহরে গেলে গরু, তৃতীয় প্রহরে গেলে ভেড়া, চতুর্থ প্রহরে গেলে মুরগি, আর পঞ্চম প্রহরে গেলে ডিম কোরবানির সওয়াব পায়। এরপর ইমাম খুতবা শুরু করলে ফেরেশতারা আর আমল লিখে না, বরং খুতবা শোনে। (বুখারি: ৮৮১, মুসলিম: ৮৫০)

 

 

পরপর তিন জুমা না পড়লে ভয়াবহ পরিণতি :

 

জুমার নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করার বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি পরপর তিন জুমা ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর এঁটে দেন। (তিরমিজি: ৫০০, আবু দাউদ: ১০৫২, নাসাঈ: ১৩৭০, সহিহ হাদীস)

 

 

 

অন্য বর্ণনায় এসেছে—

 

যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমা ত্যাগ করে, সে ইসলামকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।

(মুসলিম: ৮৬৫)

 

 

এখানে “অন্তরে মোহর এঁটে দেওয়া” মানে হলো— তার হৃদয় ঈমান ও নেক আমলের আলো থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহর ভয় ও নসীহত গ্রহণ করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। পরিণতিতে ধীরে ধীরে সে গাফেল ও পাপাচারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।

 

তবে ইসলাম যেকোন বিধানে দূর্বল, অসামর্থ্যবানদের প্রতি সবসময় খেয়াল রাখে। যার ধারাবাহিকতায় জুমার নামাজেও কিছু শ্রেণীর লোকদের উপর ইসলাম জুমার ফরযিয়্যাতকে রহিত করে দিয়েছেন।

 

কারা জুমার নামাজ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন :

 

হাদীসে এসেছে—

 

জুমার নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর ফরজ, তবে চার শ্রেণির মানুষ এর ব্যতিক্রম: ক্রীতদাস, নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, এবং মুসাফির।

(আবু দাউদ: ১০৬৭, হাকেম: ১/২৯১)

 

 

 

অন্যদিকে অসুস্থ ব্যক্তিকেও ইসলামী ফকিহরা ছাড় দিয়েছেন, কারণ আল্লাহ বলেন—

 

আল্লাহ কোনো প্রাণীর উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। (সুরা বাকারা: ২৮৬)

 

 

নামাজ ত্যাগের ভয়াবহতা :

 

সাহাবায়ে কিরাম নামাজ ত্যাগকে ঈমানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করতেন।

 

হজরত উমর (রা.) বলেছেন, নামাজ ত্যাগকারী নির্ঘাত কাফের। (বায়হাকি: ১৫৫৯)

 

 

হজরত আলি (রা.) বলেন, যে নামাজ পড়ে না, সে কাফের।

(বায়হাকি: ৬২৯১)

 

 

রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও বলেছেন, আমাদের ও তাদের (অবিশ্বাসীদের) মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা হলো নামাজ; যে নামাজ ত্যাগ করে, সে কাফের। (তিরমিজি: ২৬২১, সহিহ মুসলিম: ৮২)

 

মোটকথা, নামাজ হচ্ছে মুসলমানের জীবনশক্তি, আর জুমার নামাজ তার সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। তিন জুমা ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা শুধু গাফেলতাই নয়, বরং অন্তরের ঈমানকে ম্লান করে দেয়। এজন্য প্রতিটি মুসলমানের উচিত জুমার নামাজের গুরুত্ব বোঝা, সময়মতো মসজিদে উপস্থিত হওয়া এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা।

 

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং জুমার মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দিন, আমিন।

 

সংকলক –

হা. মুফতি দেলোয়ার হোসাইন মাহদী

মিডিয়া কর্মী, খতীব, শিক্ষক, সংগঠক

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ০

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার ↗ PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ ↗ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী ↗ PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ ↗