
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা সোহরাব মিয়ার (২৬) নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকা রূপ নিয়েছে ভুতুড়ে জনপদে।
ঘটনার পরপরই প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধের দৌরাত্ম্যে পুরো ইউনিয়নে শুরু হয় তাণ্ডব। বাড়ি-ঘরে আগুন, দোকানে লুটপাট এবং নিরীহ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতনের ফলে শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে প্রায় পুরো গ্রাম, শুধুই রয়ে গেছে অসহায় নারী ও শিশুর কান্না আর পোড়া ঘরের ধ্বংসস্তূপ।
গত শনিবার (৫ জুলাই) মোল্লা গোষ্ঠী ও উল্টা গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে নিহত হন চাতলপাড় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সোহরাব মিয়া। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি মোতাহার মিয়া (মোল্লা গোষ্ঠী) ও যুবদল সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিনের (উল্টা গোষ্ঠী) মধ্যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পোড়া টিন, ভাঙা আসবাবপত্র ও কাচ। কয়েকটি বাড়িতে এখনো ধোঁয়া উড়ছে।
ষাটোর্ধ্ব মমতাজ বেগম বলেন, “আমরা কারো পক্ষ নেই। তবু মোল্লা গোষ্ঠীর লোকজন আমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে চুলা, আসবাব, এমনকি পানির টিউবওয়েল পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেছে। তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছি, খাবারও নেই।
সাফিয়া বেগম জানান, “আমার ছেলের ঋণের টাকায় বানানো ঘরটা পুড়িয়ে দিয়েছে। স্বামী অসুস্থ, এখন আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। সব শেষ হয়ে গেলো।”
অন্তঃসত্ত্বা কুহিনূর বেগম বলেন, “অস্ত্রের মুখে গলা থেকে গয়না ছিনিয়ে নিয়ে ঘরের ওষুধসহ সব লুটে নেয়। আমাকে হাত-পা বেঁধে ফেলে যায়।
চাতলপাড়ের কাঠালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুহিনা বেগম জানান, “৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০০ জনের বেশি অনুপস্থিত। আতঙ্কে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণির ২১ শিক্ষার্থী। এমনকি একজন শিক্ষকও নিরাপত্তাহীনতায় ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অভিভাবকদের ফোনেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইসহাক মিয়া বলেন, “শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা কমিটির সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা হবে।
চাতলপাড় বাজারের ছয়টি দোকান—চাল আড়ত, মোবাইল ও বিকাশ সেবা, রড-সিমেন্টসহ—পূর্ব পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের শিকার হয়। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে। এছাড়া ১০টি গরু ও এক হাজার মণ ধানও নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হামজা বলেন, “আমার দোকানের সবকিছু লুটে নিয়ে গেছে। হাতে ছিল ২৫ লাখ টাকা—সব শেষ। এখন পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।”
উল্টা গোষ্ঠীর নেতা গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, “আমাদের গোষ্ঠীর পাঁচটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে এবং ৪০টির বেশি বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও জাসাস নেতাদের বাড়িও হামলা থেকে রক্ষা পায়নি।”
অন্যদিকে, নিহত ছাত্রদল নেতা সোহরাবের ভাই মোজাহিদ মিয়া বলেন, “আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। কিন্তু আমরা কারো বাড়িতে হামলা চালাইনি, এসব অভিযোগ মিথ্যা।”
চাতলপাড় পুলিশ ফাঁড়ির তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “জনবল কম এবং যাতায়াতের অসুবিধার কারণে এলাকায় প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। নিহতের স্বজনরা টেঁটা-বল্লম নিয়ে পাহারা দিচ্ছে, তাই নিরাপত্তার অভাবেও অভিযান চালানো যাচ্ছে না।”
