শুধু ক্ষমতার রদবদল আমাদের চূড়ান্ত ও প্রকৃত মুক্তি দেবে না:প্রকৃত মুক্তির জন্য আমাদের করণীয় কি?

লেখক: মোহাম্মদ জাহাঙ্গির আলম
প্রকাশ: ১ দিন আগে

আমি রাজনৈতিকভাবে ‘বালেগ’ হওয়ার পর থেকেই আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় দেখেছি এবং এদের ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ এবং জুলুম-নিপিড়ন দেখে দেখে তাদেরকে চূড়ান্ত ঘৃণা করেছি,এখনো করি।কিন্তু তারপরও আমি চাইতাম না যে,এই আওয়ামী রেজিমকে পরিবর্তন করার জন্য কোন মানুষ নিহত হোক,আহত হোক, গুম হোক, বা জেলে পঁচুক।আর ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে তো এটাও চাইতাম না যে,তারা মিছিল-মিটিং করুক বা রাস্তায় নামুক, বা সোসাল মিডিয়ায় সরকার বিরোধী লেখালেখি করুক(যদিও আমি নিজেই লেখালেখি করেছি এবং করছি)।

 

উপরোক্ত কথা শোনার পর আপনি আমাকে দালাল,ভীতু,কাপুরুষ বা আরো বহুকিছুই ভাবতে পারেন কিন্তু এতে আমার কিছুই যায় আসেনা।এখন প্রশ্ন আসতে পারে,কেন আমি এমন একটি অবস্থান নিলাম, যা বাহ্যত ভীরুতা এবং কাপুরুষতা মনে হয়?

এর সহজ উত্তর হল,আমার মতে কোন আদর্শিক ও উন্নত লক্ষ্য ছাড়া শুধু কোন রেজিম পরিবর্তনের জন্য জান,মাল,রক্ত দেয়া বা জেল খাটা ও ঘাম ঝড়ানো একটি অহেতুক কাজ (নিচে বর্ণিত আদর্শিক প্রচেষ্টা ও অর্জন সাপেক্ষে তা অবশ্যই অর্থবহ হবে,ইনশাআল্লাহ।কিন্তু কোন আদর্শিক লক্ষ্য ছাড়া এটি সত্যিকার অর্থেই অহেতুক থেকে যাবে); যার দুনিয়াবী ও পরকালীন কোন উপকারিতা নেই।কারণ-

ক.উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়,তৎকালীন আওয়ামী রেজিম পরিবর্তন করার পর কারা ক্ষমতায় আসবে?যারা ক্ষমতায় আসবে তারা কি মৌলিকভাব আওয়ামীলীগ থেকে ভালো?তারা কি ইসলাম,মুসলমান ও জনতার কল্যাণের রাজনীতি করে?এই রেজিম পরিবর্তন করলে কি দেশ থেকে গণধর্ষণ,খুন,গুম ও দূর্নীতি নিঃচিন্হ হয়ে যাবে?সবগুলোর উত্তর হবে না?তাহলে আওয়ামী রেজিম পরিবর্তন করতে জান,মাল,রক্ত দেয়াতে কি উপকার হবে?

খ.আমাদের দেশের যে দূষিত সিস্টেম, যে নষ্ট এস্টাবলিশমেন্ট,টপ টু বটম যে নিপীড়নমূলক মানসিকতা,সমাজের অধিকাংশ মানুষের যে স্বার্থপরতা ও ভোগবাদী জীবনাচার,সুযোগ পেলেই জালিম হয়ে ওঠার যে সর্বব্যাপী রোগ তা কি নির্দিষ্ট কোন রেজিম পরিবর্তনের দ্বারা পরিবর্তিত হবে?উত্তর হবে না।তাহলে কূয়াতে পচাগলা শুয়র রেখে এর পানি পরিবর্তনে জান,মাল উৎসর্গ করার কি উপকারিতা?

প্রশ্ন আসতে পারে,এটা যদি আমার চিন্তা হয় তাহলে আগে বলিনি কেন?এর উত্তর হলো-

ক.আগেও বলেছি,হয়তো এমন গোছালোভাবে বলিনি না।

খ.আগে অর্থাৎ ৫’ই আগস্ট ২০২৪ এর আগে বললে আমার কথা সেরেফ থিওরী বা কল্পনা মনে হতো।কিন্তু বর্তমান সময়ে আমার চিন্তা জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে,ফলে আমার প্রমাণ করার প্রয়োজনীয়তা আর থাকল না।

 

গ.আমি সময় নিতে চাইছিলাম,যেন ভালভাবে এর সকল দিক সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যায়।আলহামদুলিল্লাহ, গত কয়েক বছরের চিন্তা এবং ৫’ই আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতা আমাকে আমার চিন্তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে।

তাহলে আবার প্রশ্ন আসতে পারে,তাহলে আমি কি অকর্মা ও কাপুরুষ হয়ে বসে থাকার পক্ষপাতী?আমি কি ইসলাম,মুসলমান ও জনতার কল্যাণে পরিবর্তন চাই না?এর উত্তর হল,আমি অকর্মা ও কাপুরুষের মত বসে থাকার পক্ষপাতী না এবং অবশ্যই ইসলাম,মুসলমান এবং জনতার কল্যাণে আমি পরিবর্তন চাই।কারণ এই কল্যাণকামীতাই দ্বীন।

এক্ষেত্রে আমার চিন্তা হলো,বাংলাদেশের ইসলাম,মুসলমান ও জনতার কল্যাণে নিম্নোক্ত পদ্ধতি ও ক্রমধারা অনুসরণ করে কাজ করা চাই;অন্যকোন দেশ বা জাতীর কোন রেডিমেট মডেলের ফটোকপিতে আমি বিশ্বাসী না এবং গত ৫০ বছরে এগুলোর অসফল পরীক্ষাও হয়েছে।ফলে আমার  মতে দেশ ও জনতার পূর্নাঙ্গ পরিবর্তন করতে হলে নিম্নোক্ত কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে করতে হবে-

১.যে সকল মুসলমান ইসলাম,মুসলমান ও জনতার কল্যাণে কাজ করতে চায় তারা  সকল ধরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেবে এবং নিজেদের আত্মশুদ্ধি,চারিত্রিক উন্নয়ন,দ্বীনি এবং দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জন এবং ইবাদতের মধ্যমে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় এবং যোগ্য বান্দা হয়ে ওঠার পরিপূর্ণ চেষ্টা করবে।

২.যখন তাদের মনে হবে যে,তারা আত্মিক ও চারিত্রিকভাবে,জ্ঞান ও কৌশলে এবং আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের মধ্যমে এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে,বিদ্যমান দূষিত সমাজের কোন দূষণ আর তাদের উপর প্রভাব ফেলতে পারবে না এবং তারা নিজেরা এতটা আত্মপ্রত্যয়ী হবে যে,উল্টো তারা  সমাজকে প্রভাবিত করতে পারবে,তখন তারা আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে সমাজ সংশোধনে মনোযোগ দেবে।সাথে সাথে এক নং কাজের ধারাবাহিকতা যেন চালু থাকে,সেদিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি রাখবে।এবং সমাজ সংশোধনের এই মহতি কাজ শুরু করবে নিজের পরিবার-পরিজন,আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মধ্যমে এবং ক্রমান্বয়ে এই কাজের বিস্তৃতি ঘটাবে।

৩.যখন সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ আত্মশুদ্ধি,চারিত্রিক উন্নয়ন,জ্ঞান অর্জন এবং ইবাদতের মধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে এবং জনতার একটি বড় অংশ তাদের দ্বারা প্রভাবিত হবে তখন ইনশাআল্লাহ ওয়াদা মোতাবেক আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই জমিনের বুকে কর্তৃত্ব দান করবেন।যেন আমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহ তায়ালার গোলামি করার এবং মানুষের কল্যাণ করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি।

৪.যারা এই পরিবর্তনে আত্মনিয়োগ করবে তাদের এই দুনিয়ার সকল চাহিদা ভেতর থেকে বের করে দিতে হবে।আল্লাহ তায়ালার পথে সকল কিছু উৎসর্গ করার এবং সকল ব্যথা,বেদনা,অপমান সহ্য করার মানসিকতা ভেতরে তৈরী করতে হবে।

৫.তো আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক ওয়াদাকৃত সেই কর্তৃত্ব হয়তো বিনা রক্তপাতেই আসবে,যেমন মুজাদ্দিদ এ আলফেসানী রহিমাহুল্লাহর বদৌলতে আল্লাহ তায়ালা বাদশা আওরঙ্গজেব আলমগীরের মধ্যমে দিয়েছিলেন নয়তো রক্তপাতের মধ্যমে আসবে,যেমনটা ইসলাম ও পৃথিবীর ইতিহাসে বহু বার,বহু জায়গায় এসেছে।ক্ষমতার দম্ভ অন্ধ ও বিবেকহীন হয়ে যাওয়া বহু রেজিমকে মানুষ তাদের কলিজার খুন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে দিয়েছে!

৬.আর যারা উপরোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন না করে গতানুগতিক রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে লিপ্ত থাকবে তারা চেষ্টা করবে তাদের রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলন যেন উপরোক্ত কাজে যারা আত্মনিয়োগ করবে তাদের পথ পরিষ্কার রাখে এবং যেহেতু উপরোক্ত পদ্ধতিটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী আন্দোলন তাই এই দীর্ঘ সময়ের তাৎক্ষণিক যত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন আছে,তা যেন তারা পূরণ করে।

৭.ধর্ম,বর্ণ, ও লিঙ্গভেদ  থেকে বেরিয়ে প্রতিটি সৎ,জ্ঞানী ও যোগ্য মানুষের মাঝে সম্প্রীতি ও ভালবাসার বন্ধনকে শক্ত করতে হবে।প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান দিতে হবে।যারা ধর্ম,বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে ঘৃণা ও বৈষম্য ছড়ায় তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।এদেশ যেন সকল ধর্মের,সকল বর্ণের,সকল লিঙ্গের এবং সবল-দূর্বল সবার হয়ে উঠে তা নিশ্চিত করতে হবে।সবাই সবার অধিকার ভোগ করবে তবে কেউ যেন কোন ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য সব সময় এবং সবার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।সবাই সবার ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সুন্দরভাবে বসবাস করার পরিস্থিতি তৈরী করতে হবে।

মনে রাখতে হবে,উপমহাদেশে যত ফলপ্রসূ পরিবর্তন হয়েছে তার সব কয়টিই উপরোক্ত পদ্ধতি ও ক্রমবিন্যাসেই হয়েছে;হয়তো সুস্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে।তাই আমরাও যদি আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন চাই,মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি চাই,দেশকে খুন,দর্শন ও দূর্নীতির মতো মহামারি থেকে বাঁচাতে চাই তবে আমাদেরও উপরোক্ত পথেই হাঁটতে হবে।

প্রকৃত এবং আখাঙ্খিত সেই পরিবর্তনের জন্য কোন শটকার্ট রাস্তা বা কপিকৃত পদ্ধতি নেই।