ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া ও দালাল সিন্ডিকেটের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। এবার হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। পরে ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও এনডিসি রাশেদুল হক সজীব উপস্থিত হলেও কোনো মামলা, জরিমানা কিংবা লিখিত সতর্কতা ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় উপরমহলের নির্দেশে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
একাধিক সূত্রের অভিযোগ, মাসুম দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠানোর চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। চক্রটির সঙ্গে রাজনৈতিক মহলের কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া চক্রটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ভিটামিন, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও মেডিসিন পণ্য চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এসব পণ্যের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা এবং সরবরাহের সঙ্গে হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের কথিত যোগসাজশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার (১ নভেম্বর)। অভিযোগ রয়েছে, ওই দিনও মাসুম হাসপাতাল থেকে রোগী বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় জরুরি বিভাগের সামনে তাঁর গতিবিধি ও রোগীদের সঙ্গে কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাঁকে আটক করেন। পরে বিষয়টি জানানো হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এনডিসি রাশেদুল হক সজীব।
আটক অবস্থায় মাসুম উপস্থিত সাংবাদিকদের আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও কেন কোনো লিখিত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে এনডিসি রাশেদুল হক সজীব বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটিত হওয়া বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর উপস্থিতিতে দালালির কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাই মামলা বা জরিমানা না করে মৌখিকভাবে সতর্ক করে মাসুমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, মাসুম তাঁর বোনকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। উপরমহলের নির্দেশে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে কোনো ফোনকল বা নির্দেশনা পাননি বলেও জানান তিনি।
এনডিসি আরও দাবি করেন, পুলিশ মাসুমকে আটক করেনি; হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁকে আটক করে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। পরে তাঁকে দালাল হিসেবে প্রমাণ করতে না পারায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে মাসুমকে আটকের সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মাসুমকে বিভিন্ন রোগীর সঙ্গে সন্দেহজনকভাবে কথা বলতে দেখা যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দালালির সন্দেহ তৈরি হওয়ায় তাঁকে আটক করা হয়। আটকের সময় তাঁর সঙ্গে কোনো নারী ছিলেন না; তবে আটকের পর এবং এনডিসি ঘটনাস্থলে আসার পর কয়েকজন নারী সেখানে উপস্থিত হন। পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে দালালির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও প্রথমবারের মতো তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের হয়রানি ও বেসরকারি ক্লিনিকে ভাগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে হাসপাতাল প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেছেন সচেতন নাগরিকরা। একই সঙ্গে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।