
সামাজিকতা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, ভদ্রতা, সহমর্মিতা ও প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের সমষ্টি। এই মূল্যবোধ মানুষকে একাকীত্ব থেকে বের করে এনে একটি সুশৃঙ্খল, সংঘবদ্ধ ও মানবিক সমাজ গঠনে সহায়তা করে। ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ত্যাগের মানসিকতা—এসবই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।
একটি আদর্শ সমাজে প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। আর যারা সমাজে নেতৃত্ব দেয়, তাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো অধীনস্থ মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, সমাজের একটি অংশের নেতৃত্বের মধ্যে অদ্ভুত এক ভীতি কাজ করছে—ক্ষমতা হারানোর ভয়। তারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে নিজেদের অবস্থান হারানোর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে নানা কৌশল ও অপকৌশলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। কখনো ভয়ভীতি, কখনো সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি—সবই যেন ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার।
এভাবে সমাজকে কুক্ষিগত করার প্রবণতা মূলত মানুষের অধিকার খর্ব করে এবং একটি বড় অংশকে নীরব দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, সমাজকে বোঝার মতো বয়স ও বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণ নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় এগিয়ে আসছে। অথচ আমাদের সমাজের এক শ্রেণির তথাকথিত প্রথাগত নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। তারা সামাজিক নেতৃত্বকে যেন পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়।
এই মানসিকতা সমাজে একটি অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে যোগ্যতা নয়, বরং প্রভাব ও গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে অনেক সচেতন মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, “একলা চল” নীতি গ্রহণ করছে। এর ফলাফল হিসেবে সামাজিক সহমর্মিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এতে সমাজের ভিত দুর্বল হচ্ছে, মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, বাড়ছে মনোমালিন্য—কমছে ঐক্য ও সম্প্রীতি। দুঃখজনকভাবে, এই অবস্থাকে কিছু স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন সমাজনেতা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখলেও বাস্তবে তা সমাজের জন্য গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—সামাজিক নেতৃত্বে এমন কী আছে, যার জন্য এত প্রতিযোগিতা, এমনকি অপকৌশল? বাস্তবতা বলছে, এর পেছনে রয়েছে প্রভাব বিস্তার, সুবিধা আদায়, শালিসি ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন, এমনকি অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণের মতো অশুভ উদ্দেশ্য।
ফলে একদল অযোগ্য ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর থাকে। আর কিছু সুবিধাবাদী মানুষ স্বল্প লাভের আশায় এই অন্যায় কাঠামোকে নীরবে মেনে নেয়। এর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয়ে যায়, বাড়ে হানাহানি, ধ্বংস হয় ভ্রাতৃত্ববোধ।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ একটাই—সচেতনতার জাগরণ ও সম্মিলিত প্রতিরোধ। সমাজকে এই অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে হলে সচেতন মানুষকে একত্র হতে হবে। ভয়কে জয় করে ন্যায়, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।
নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি তুলতে হবে। সিন্ডিকেটনির্ভর সামাজিক কাঠামো ভেঙে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক:
মোঃ মাহফুজুর রহমান পুষ্প
সভাপতি, মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া চাই
সাধারণ সম্পাদক, ৭ নং ওয়ার্ড বিএনপি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা
