সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ‘মিম’-এর ইতিহাস ও উৎপত্তির গল্প

বর্তমানে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ ও বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ‘মিম’। তবে ইন্টারনেট যুগের অনেক আগে থেকেই মিমে ব্যবহৃত ধারণার চর্চা ছিল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ‘মিম’-এর ইতিহাস ও উৎপত্তির গল্প
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

ফিচার ডেস্ক: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ন

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয় ব্যবহারকারীদের কাছে ‘মিম’ অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দ। মূলত কোনো বিষয়ভিত্তিক হাস্যকর ছবি, ভিডিও বা লেখাকে মিম বলা হয়ে থাকে, যা মানুষকে বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি ব্যঙ্গ প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। তবে বর্তমানে শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠা এই মিমের ইতিহাস ও উৎপত্তি সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, মিম কেবল সাম্প্রতিক ইন্টারনেট যুগের সৃষ্টি নয়; মানুষ শত শত বছর ধরে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করে আসছে। এটি মূলত সাংস্কৃতিক কথোপকথনের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

শব্দ হিসেবে মিমের ব্যবহার বেশ পুরোনো। নিউইয়র্ক টাইমস ক্রসওয়ার্ড পাজলে ১৯৪০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত মিম শব্দটি প্রায় ষাটবার ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স প্রথম ‘মিম’ শব্দটি আধুনিক অর্থে ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, মিম হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারা তথ্যের টুকরা। মানুষের মধ্যে অন্যকে কিছু বারবার বলা বা ভেটকি দেওয়ার প্রবণতা থেকেই এর বিস্তার ঘটে। ভাষাগত দিক থেকে ফরাসি শব্দ ‘মেমে’ অর্থ একই এবং গ্রিক শব্দ ‘মিমৌমাই’ অর্থ অনুকরণ করা। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে মাইক গডউইন ইন্টারনেটের প্রসঙ্গে প্রথম মিম শব্দটি ব্যবহার করেন।

বিজ্ঞানী ডকিন্সের মতে, মানুষের ধারণা, আদর্শ, সংস্কৃতি ও প্রথা ভাইরাসের মতো অনুকরণ ও শেয়ারের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণেও মিম জাতীয় ধারণার ঐতিহাসিক উপস্থিতি দেখা গেছে। প্রাচীন অ্যান্টিওক শহরে পাওয়া খ্রিষ্টপূর্ব তিন অব্দে তৈরি একটি মোজাইকে তিনটি ফ্রেমে গোসলের দৃশ্য ও কঙ্কালের আনন্দ উদযাপনের ছবি ফুটে উঠেছে, যার নিচের শলেখা বার্তায় জীবন উপভোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই চিত্রটিকে ইতিহাসের আদি ‘ওয়াইওএলও’ (ইউ অনলি লিভ ওয়ান্স) বা ‘আপনি একবারই বাঁচবেন’ ধারণার মিম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঐতিহাসিক অন্যান্য মিমের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কিলরয়’ চিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সৈনিকদের মধ্যে এটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। বোঁচা নাক ও দীর্ঘ অবয়বের এই কিলরয় ছবিটির মূল উৎস হিসেবে জাহাজ পরিদর্শক জেমস কিলরয় বা সেনাকর্মী ফ্রান্সিস কিলরয়ের কথা বলা হলেও সঠিক ইতিহাস নিশ্চিত জানা যায়নি। তবে তৎকালীন সময়ে জার্মানরা এই চিহ্ন দেখে কিলরয়কে কোনো বাস্তব গুপ্তচর হিসেবেও সন্দেহ করেছিল।

ডিজিটাল মিম প্রসঙ্গে জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিমোর শিফম্যান জানান, এসব মিম কেবল একটি একক ধারণা নয়, বরং একে অপরের সম্পর্কে সচেতন থেকে তৈরি করা ধারণার সমষ্টি। উদাহরণস্বরূপ ‘পেপে দ্য ফ্রগ’ চরিত্রটির কথা বলা যায়, যা সাধারণ ব্যাঙের চরিত্র হলেও পরবর্তীতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রতীকে রূপ নেয়। ব্যবহারকারীরাই তাদের সচেতনায় নির্ধারণ করেন কোন মিম ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে জনপ্রিয় হবে।

ডিজিটাল মিমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো না হলেও এর টিকে থাকার ক্ষমতা প্রবল। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘ড্যান্সিং বেবি’ বা নাচের শিশুর মিমকে অনেকে প্রথম ডিজিটাল মিম হিসেবে গণ্য করেন, যা ডাউনলোড করতে তখন দীর্ঘ সময় লাগত। ২০০০ সালের পর ইন্টারনেটভিত্তিক চ্যাটরুম এবং ২০১০ সালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর জনপ্রিয়তার সাথে সাথে মিম দ্রুত বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে পশ্চিমা দুনিয়ার পাশাপাশি এশিয়া অঞ্চলের নানা ছবি ও ঘটনাও মিম আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

আধুনিক যুগে মিম এমন একটি মিডিয়ায় পরিণত হয়েছে, যা মূলত হাস্যরসের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছায়। পপ-সংস্কৃতির নানা ঘটনা মিম তৈরির বড় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এটি খুব সহজে ও অল্প সময়ে বোধগম্য হওয়ায় ইন্টারনেটে মানুষকে যুক্ত করতে সাহায্য করে। তবে নির্দিষ্ট উৎস বা বিষয় সম্পর্কে ধারণা না থাকলে সবার পক্ষে সব মিমের মূল অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব হয় না।

অথেন্টিক সোর্স: প্রথম আলো
মূল প্রতিবেদনের লিংক সংরক্ষিত।  মূল সূত্র যাচাই করতে উপরের লিংক ব্যবহার করুন।
পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ