এই ‘আছে’ আর ‘নেই’-এর মাঝখানেই আটকে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আমি চাই তিতাসের গ্যাসের খবর শুনে আমরা শুধু জাতীয় গ্রিডে কত মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলো সেই হিসাব না করি, পাশাপাশি প্রশ্ন করি, এই সম্পদকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের দক্ষতা উন্নয়নের কী পরিকল্পনা রয়েছে।
32860
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

কখনো কখনো নিজের জেলার দিকে তাকিয়ে আমার খুব অবাক লাগে। মনে হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যা আছে, বাংলাদেশের অনেক জেলারই তা নেই। আবার মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক নাগরিক সুবিধার দিকে তাকালে মনে হয়, আমাদের যেন কিছুই নেই।

এই ‘আছে’ আর ‘নেই’-এর মাঝখানেই আটকে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আমাদের আশুগঞ্জ নৌবন্দর আছে। আখাউড়া স্থলবন্দর আছে। আশুগঞ্জ সার কারখানা আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আছে। সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগের সুবিধা আছে। রাজধানী ঢাকাও খুব বেশি দূরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সীমান্ত বাণিজ্যের সুযোগ একসঙ্গে বিবেচনা করলে এই জেলা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারত।

কিন্তু হয়নি।
কেন হয়নি?
এই প্রশ্নটা আমাকে পোড়ায়।

আরও বেশি পোড়ায় এই কারণে যে, আমরা প্রশ্নটাও খুব একটা করি না।

আমাদের মাটির নিচ থেকে গ্যাস ওঠে। আমাদের ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। আমাদের নদীবন্দর দিয়ে পণ্য যায়। আমাদের সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য হয়। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্পর্ক নতুন নয়। অথচ এসব জাতীয় সম্পদের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় মানুষের প্রাপ্তি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে আমাদের সম্মিলিত আলোচনা কতটুকু?

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ নিয়ে নতুন খবরটি দেখার পর পুরোনো প্রশ্নটি আবার মাথায় এসেছে। নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাবে। দেশের জ্বালানি সরবরাহে যুক্ত হবে। দেশের জন্য অবশ্যই এটি আনন্দের সংবাদ।

কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন নাগরিক হিসেবে আমার খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন আছে:

তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কী?

প্রশ্নটি সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার নয়। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটির নিচে পাওয়া গ্যাস শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জন্য আটকে রাখতে হবে, এমন কথা নিশ্চয়ই কোনো বিবেকবান মানুষ বলবেন না।

আমিও বলছি না।
আমি জানতে চাই অন্য কথা।

যে জেলা দেশের জ্বালানি দেয়, সেই জেলাকে ঘিরে শিল্পায়নের বিশেষ পরিকল্পনা কোথায়? যে জেলায় গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর ও স্থলবন্দর রয়েছে, সেখানে বড় লজিস্টিকস ও শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু কাজে লাগানো হয়েছে? স্থানীয় তরুণদের জন্য এসব সম্পদকে কেন্দ্র করে কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে? আমাদের যোগাযোগ সুবিধা, সীমান্ত, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং বন্দরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে আনার আলোচনা কোথায়?

সম্ভবত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগেই আমরা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

আমাদের সভা আছে। সেমিনার আছে। সংবর্ধনা আছে। ব্যানার আছে। ফুল আছে। প্রধান অতিথি আছে। বিশেষ অতিথি আছে। ছবি আছে। ফেসবুক পোস্ট আছে।

শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগামী বিশ বছরের স্বপ্নটা কোথায়, সেটাই আমি খুঁজে পাই না।

আমরা কে কোন পদ পেলাম, কে কোথায় বসলাম, কার সঙ্গে কার ছবি উঠল, কে কাকে ফুল দিলাম, এসব নিয়ে যতটা উৎসাহী, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাস করবে তা নিয়ে কি ততটা উৎসাহী?

নিজেকেও এই প্রশ্নের বাইরে রাখছি না।
আমরা সাংবাদিকেরা কী করছি?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ হলে সেটি সংবাদ হবে, অবশ্যই হবে। অপরাধ হলে লিখতে হবে। অনিয়ম হলে প্রকাশ করতে হবে। সাংবাদিকতার দায়িত্ব সত্যকে আড়াল করা নয়।

কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি সত্যও তো আছে।
এই জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে।
শিল্পায়নের সম্ভাবনা আছে।
সীমান্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে।
নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা আছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা আছে।
সাহিত্য-সংস্কৃতির অসাধারণ ঐতিহ্য আছে।
এই গল্পগুলো আমরা কতটা বলেছি?

দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নামের সঙ্গে ‘মারামারি’ শব্দটি এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেন কয়েকটি এলাকার সংঘর্ষপ্রবণতাই প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের একটি জেলার একমাত্র পরিচয়।

আমরাও কখনো কখনো এই পরিচয়টিকে ভাঙার বদলে বহন করেছি।

একটা সংঘর্ষের ভিডিও যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, একটি সম্ভাবনার গল্প কি তত দ্রুত ছড়ায়?
একটি টেঁটার ছবি যত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, একজন তরুণ উদ্যোক্তার গল্প কি পৌঁছায়?

একটি গ্রামের বিরোধ নিয়ে যত আলোচনা হয়, আশুগঞ্জকে ঘিরে ভবিষ্যৎ শিল্পাঞ্চল নিয়ে তার অর্ধেক আলোচনাও কি হয়?

তাহলে বাইরের মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে অন্যভাবে চিনবে কী করে?
আমাদের নিজেদের গল্প যদি আমরা নিজেরাই না বলি, অন্যরা আমাদের সবচেয়ে আলোচিত গল্প দিয়েই আমাদের চিনবে।

এখানেই আমার কষ্ট।
আমাদের সংকট শুধু ভাবমূর্তির নয়।
চিকিৎসার সংকট আছে। একটি জটিল রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন হলে এখনও ঢাকার দিকে তাকাতে হয় বহু পরিবারকে। মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন আছে। মাদক আমাদের তরুণদের জন্য ভয়াবহ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। সংস্কৃতিচর্চার জন্য আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামোর প্রয়োজন আছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ, নদী, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়নসহ অসংখ্য প্রশ্ন আমাদের সামনে পড়ে আছে।

তারপরও আমরা দিব্যি আছি।
এই ‘দিব্যি থাকা’টাই সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর।
মানুষ যখন বঞ্চিত হয়, তখনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু মানুষ যখন বঞ্চনাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে, তখন সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ শুরু হয়।

আমাদের আছে বলে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারি।
আমাদের গ্যাস আছে।
বিদ্যুৎ আছে।
বন্দর আছে।
সার কারখানা আছে।
ইতিহাস আছে।
ঐতিহ্য আছে।
খ্যাতিমান মানুষ আছে।
সবই আছে।

শুধু এই ‘আছে’গুলোকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জীবনের পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার সম্মিলিত স্বপ্নটা কোথায়?

আমি কাউকে একা দায়ী করতে চাই না।
কারণ দায় যদি থাকে, তার অংশ আমাদের সবারই আছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের আছে। জনপ্রতিনিধিদের আছে। প্রশাসনের আছে। ব্যবসায়ী সমাজের আছে। সাংবাদিকদের আছে। নাগরিক সমাজের আছে। প্রবাসীদের আছে। শিক্ষিত সমাজের আছে। তরুণদের আছে।

আমারও আছে।
আমরা কি কখনো দল-মত, উপজেলা, পেশা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য দশটি অভিন্ন দাবি ঠিক করেছি?
আমরা কি বলেছি, আগামী দশ বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আমরা কোথায় দেখতে চাই?
আমাদের কি কোনো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২০৪০’ আছে?

কোথায় শিল্প হবে?
কোথায় নতুন কর্মসংস্থান হবে?
আশুগঞ্জ নৌবন্দর ও আখাউড়া স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে কী অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হতে পারে?
কীভাবে স্থানীয় তরুণদের দক্ষ করে এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যাবে?

কেমন হাসপাতাল দরকার?
কেমন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার?
কেমন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দরকার?
কীভাবে মাদক ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠবে?

কীভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিচয় বদলাবে?
এই প্রশ্নগুলো কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়।
এগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রশ্ন।
আজ যে ক্ষমতায়, কাল সে নাও থাকতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে, সরকার বদলাবে, জনপ্রতিনিধি বদলাবে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া থাকবে।

তাই জেলার কিছু দাবি হওয়া উচিত স্থায়ী।
আমার স্বপ্ন খুব জটিল নয়।
আমি এমন একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেখতে চাই, যেখানে একজন তরুণকে কাজের জন্য বাধ্য হয়ে ঢাকা ছুটতে হবে না। বরং অন্য জেলার তরুণও কাজের সন্ধানে এখানে আসবে।

আমি এমন আশুগঞ্জ দেখতে চাই, যেখানে বন্দর, বিদ্যুৎ, সার কারখানা ও যোগাযোগব্যবস্থাকে ঘিরে পরিকল্পিত শিল্প ও লজিস্টিকস অঞ্চল গড়ে উঠবে।

এমন আখাউড়া দেখতে চাই, যা শুধু স্থলবন্দর নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হবে।

আমি চাই তিতাসের গ্যাসের খবর শুনে আমরা শুধু জাতীয় গ্রিডে কত মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলো সেই হিসাব না করি, পাশাপাশি প্রশ্ন করি, এই সম্পদকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের দক্ষতা উন্নয়নের কী পরিকল্পনা রয়েছে।

আমি চাই একটি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল।
আমি চাই উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান।
আমি চাই সংস্কৃতির জন্য এমন জায়গা, যেখানে আগামী প্রজন্ম টেঁটা হাতে নয়, বই, ক্যামেরা, কম্পিউটার, বাদ্যযন্ত্র কিংবা নতুন কোনো উদ্ভাবন হাতে বড় হবে।

আমি চাই আমাদের সাংবাদিকতারও একটি পরিবর্তন আসুক।
আমরা অপরাধ লিখব।
সংঘর্ষ লিখব।
অনিয়ম লিখব।
কিন্তু একই দৃঢ়তায় সম্ভাবনাও লিখব।

প্রশ্ন করব।
তথ্য খুঁজব।
কেন শিল্প হলো না, তার অনুসন্ধান করব।
কোথায় উন্নয়ন আটকে আছে, তা জানব।
কত গ্যাস যাচ্ছে, কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, কত বাণিজ্য হচ্ছে, স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব কতটুকু, এসব তথ্য মানুষের সামনে আনব।

কারণ জেলার প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু প্রশংসা করা নয়।
জেলার প্রতি ভালোবাসা মানে জেলার হয়ে প্রশ্ন করাও।
আমাদের আরেকটি কাজ করতে হবে।
‘মারামারির জেলা’ পরিচয়টি নিয়ে শুধু রাগ করলে হবে না। এটি বদলাতে হবে কাজ দিয়ে।

যে সমাজে সংঘর্ষ আছে, সেখানে সংঘর্ষ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। যে সমাজে মাদক আছে, সেখানে প্রতিরোধ গড়তে হবে। যে সমাজে শিক্ষার ঘাটতি আছে, সেখানে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে। আর যে জেলার বিপুল সম্ভাবনা আছে, সেই সম্ভাবনাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে।

পরিচয় দাবি করে পাওয়া যায় না।
পরিচয় নির্মাণ করতে হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আমরা কী হিসেবে নির্মাণ করতে চাই, এখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
গ্যাসের জেলা?
শিল্পের জেলা?
বন্দরের জেলা?
সাহিত্য-সংস্কৃতির জেলা?
বাণিজ্যের জেলা?
শিক্ষার জেলা?

আমি বলব, সবকিছুর জেলা হওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে।
কিন্তু সামর্থ্য আর অর্জন এক জিনিস নয়।
সম্ভাবনা কোনো অর্জন নয়।
মাটির নিচে গ্যাস থাকা অর্জন নয়।
ভৌগোলিক অবস্থানও অর্জন নয়।

অর্জন হলো সেই সম্পদ ও অবস্থানকে মানুষের জীবনমানের উন্নতিতে কাজে লাগাতে পারা।

সেখানেই আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন।
আমি বিপ্লব বলতে রাস্তায় আগুন বোঝাতে চাই না।আমার কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিপ্লব হবে অন্যরকম।যেদিন আমরা ব্যক্তি নিয়ে কম এবং প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেশি কথা বলব, সেদিন বিপ্লব শুরু হবে।

যেদিন সংবর্ধনার চেয়ে হাসপাতালের দাবি বড় হবে, সেদিন বিপ্লব হবে। যেদিন কে কোন দলের সেই পরিচয়ের আগে জেলার একটি যৌক্তিক দাবিতে মানুষ পাশাপাশি দাঁড়াতে পারবে, সেদিন বিপ্লব হবে।

যেদিন একজন সাংবাদিক সংঘর্ষের খবরের পাশাপাশি জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে আগ্রহী হবেন, সেদিন বিপ্লব হবে।

যেদিন আমাদের সন্তান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে কোনো কৌতুকের মুখোমুখি না হয়ে গর্ব করে বলবে, ‘আমি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির জেলা থেকে এসেছি’, সেদিন আমাদের রেনেসাঁ শুরু হবে।

আমার কথাগুলো অভিযোগ মনে হতে পারে।
আসলে এগুলো অভিমান।
নিজের মাটির প্রতি অভিমান।
এত সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সম্ভাবনাহীন মানুষের মুখ দেখার অভিমান।
নিজেদের সম্পদের সংবাদ জাতীয় শিরোনামে দেখে নিজের জেলার প্রাপ্তির হিসাব খুঁজে না পাওয়ার অভিমান। আর সবচেয়ে বেশি অভিমান নিজেদের ওপর।

কারণ আমরা হয়তো অনেক কিছু চাওয়ার আগেই চুপ থাকতে শিখে গেছি।

দুঃখ কারে কই?
দুঃখ আপাতত নিজের কাছেই থাকুক।
আমাদের গ্যাস আছে।
আমাদের বিদ্যুৎ আছে।
আমাদের নৌবন্দর আছে।
আমাদের স্থলবন্দর আছে।
আমাদের সার কারখানা আছে।
আমাদের ইতিহাস আছে।
আমাদের সংস্কৃতি আছে।
আমাদের মানুষ আছে।

আমরা চাইলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলতে পারি, ‘আমাদের তো সবই আছে।’
কিন্তু আমার ভয় হয়, একদিন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে,
‘এত কিছু যখন ছিল, তখন তোমরা আমাদের জন্য কী রেখে গেলে?’
সেদিন যেন উত্তর দিতে গিয়ে মাথা নিচু করতে না হয়।

তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এখন আরেকটি গ্যাসকূপের খবরের পাশাপাশি আরেকটি খবর প্রয়োজন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেগে উঠেছে।

কারও বিরুদ্ধে নয়।
নিজের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে।
নিজের উদাসীনতার বিরুদ্ধে।
নিজের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে।
নিজের সম্ভাবনাকে অবহেলা করার বিরুদ্ধে।

এই জাগরণ হোক জ্ঞান দিয়ে, গবেষণা দিয়ে, সংস্কৃতি দিয়ে, উদ্যোগ দিয়ে, নাগরিক প্রশ্ন দিয়ে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা দিয়ে।

কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবচেয়ে বড় সংকট সম্পদের সংকট নয়।

সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এত দিন নিজের শক্তিকে চিনতে না পারার সংকট।
আর যেদিন একটি জনপদ নিজের শক্তি চিনতে শেখে, সেদিন থেকেই তার ইতিহাস নতুন করে লেখা শুরু হয়।

লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ