
**বাংলাদেশের নির্বাচনী যুদ্ধ: স্বপ্ন, সংকট আর সত্যের সন্ধান**
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন—গণতন্ত্রের হৃৎপিণ্ড, স্বপ্নের পাহারাদার। সংবিধানের ছায়ায় জন্ম নেওয়া এই প্রতিষ্ঠানের কাঁধে জাতির ভোটের অধিকার, স্বাধীনতার সুরক্ষা। কিন্তু এই পথ কি সত্যিই মসৃণ? নাকি কাঁটায় কাঁটায় জর্জরিত? ভোটার তালিকার ভুল, পক্ষপাতের ছায়া, স্বচ্ছতার অভাব—এই অভিযোগগুলো যেন গণতন্ত্রের গায়ে কালির দাগ। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪—তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষত এখনো তাজা। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) তার নিরপেক্ষতার পবিত্র প্রতিশ্রুতি পালনে কোথাও কোথাও টলে গেছে। ভোটার তালিকায় ভূতুড়ে নাম, হলফনামায় দেরি, ফলাফল ঘোষণায় গাফিলতি—এসব যেন জনমনের ভরসার শিকড়ে কুঠারাঘাত। তবু এই প্রতিষ্ঠানই জাতির আশার আলো, যদি এটি তার শপথে অটল থাকে। সংবিধানের ১১৮ ও ১১৯ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ইসি হবে স্বাধীন, কেবল আইন আর সংবিধানের অধীন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে চার কমিশনার ২০২৪-এ শপথ নিয়েছেন, কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমলা নির্ভরতার অভিযোগ কি সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যায়? ২০২২-এর নিয়োগ আইন বলে, ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি ১৫ দিনে ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে, রাষ্ট্রপতি বেছে নেবেন পাঁচজন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ বা রাজনৈতিক দলের কণ্ঠ কতটা শোনা হয়? সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের তিনটি ইউনিয়নের সীমানা পুনর্নির্ধারণে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ‘ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ এসেছে, জেলা প্রশাসক ও পুলিশের কমিটি বাদ দিয়ে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবু জনমনে প্রশ্ন, এই নীতিমালা কি সত্যিই পক্ষপাতের পর্দা সরাবে? ২০২৫-এর জুলাইয়ে একটি পোস্টে অভিযোগ উঠেছে, প্রশিক্ষণের নামে ৭.৫ কোটি টাকার অপচয়। এই অর্থ জনগণের ভরসার টাকা, তা কি সঠিক পথে ব্যয় হচ্ছে? ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু ভোটার তালিকায় ভুল, তথ্য প্রকাশে দেরি—এসব কি শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি বড় কোনো ফাটলের সংকেত? সপ্তম জাতীয় ভোটার দিবসে ইসি বলেছে, “তোমার আমার বাংলাদেশে, ভোট দিব মিলেমিশে।” কিন্তু মিলেমিশে ভোট দেওয়ার পথে কাঁটা কে ছড়াচ্ছে?
সমাধানের পথ কী? ডিজিটাল ভোটার তালিকা, কঠোর নীতিমালা, সার্চ কমিটিতে বৈচিত্র্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়—এসব পদক্ষেপ কি জনগণের হারানো ভরসা ফিরিয়ে আনতে পারবে? নির্বাচন কমিশন একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জাতির বিবেক। এটি যদি টলে, গণতন্ত্রের ভিত কাঁপে। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, দক্ষতা—এই তিন শব্দই হতে পারে ইসির পুনর্জন্মের মন্ত্র। প্রশ্ন উঠুক, বিবেক জাগুক, আর জনগণের কণ্ঠ শক্তিশালী হোক—কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোট নয়, এটি জনগণের জীবন্ত আকাঙ্ক্ষা।
