পতিতাবৃত্তির ভয়াবহতা : ইসলাম ও ইতিহাসের দৃষ্টিতে

লেখক: দেলোয়ার হোসাইন মাহদী
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

পতিতাবৃত্তির ভয়াবহতা : ইসলাম ও ইতিহাসের দৃষ্টিতে

 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু কর্মকাণ্ড আছে যা সমাজের নৈতিকতা, পরিবারব্যবস্থা ও মানবসম্মানকে গভীরভাবে আঘাত করে। পতিতাবৃত্তি বা যৌন বাণিজ্য তারই একটি জঘন্য রূপ। ইসলাম ধর্ম শুধু এ কাজকে নিষিদ্ধই করেনি, বরং এটিকে সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।

 

ইসলামে পতিতাবৃত্তির নিষেধাজ্ঞা :

 

 আল-কুরআনের নিষেধাজ্ঞা:

 

আল্লাহ তায়ালা বলেন— তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।

— সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩২

 

এই আয়াতে শুধু ব্যভিচার নয়, বরং ‘তার কাছাকাছিও যেও না’ — বলে ইসলাম এর সমস্ত উপায়, পরিবেশ ও ব্যবসায়িক রূপ (যেমন পতিতাবৃত্তি) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।

 

আরও বলেন— তোমাদের দাসীদের যদি তারা পবিত্র থাকতে চায়, তবে দুনিয়ার জীবনের সামান্য লাভের জন্য তাদের জোর করে ব্যভিচারে লিপ্ত করো না।

— সূরা আন-নূর, আয়াত ৩৩

 

এই আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে, ইসলাম এমনকি বাধ্য করা বা অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রি — উভয়কেই কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।

 

হাদীসের আলোকে :

 

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন— যখন ব্যভিচার প্রচলিত হয় এবং প্রকাশ্যে হতে থাকে, তখন এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়ে যা আগে কোনো জাতির মধ্যে দেখা যায়নি।

— সহীহ ইবন মাজাহ, হাদীস: ৪০১৯

 

এই হাদীস আজকের বাস্তবতায় ভয়াবহভাবে সত্য প্রমাণিত। এইডস, যৌনবাহিত নানা রোগ এবং পারিবারিক ভাঙন— সবই পতিতাবৃত্তির সরাসরি বা পরোক্ষ ফলাফল।

 

ইসলামী সমাজব্যবস্থা ও নারী সম্মান :

 

ইসলাম নারীকে ইজ্জত, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অধিকার দিয়েছে — যাতে সে কখনো অর্থনৈতিক চাপে এমন পেশায় যেতে বাধ্য না হয়।

 

ক) নারীর মেহর

খ) উত্তরাধিকার

গ) কাজের ও সম্পদের অধিকার

এই সবই নারীকে সম্মানিত করার ইসলামের বাস্তব নীতি।

 

রাসূল ﷺ বলেছেন— দুনিয়া একটি সম্পদ, আর দুনিয়ার সেরা সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।

— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৭

 

অর্থাৎ নারীকে কেবল দেহ নয়, বরং আত্মিক মর্যাদা ও নৈতিকতার আসনে বসিয়েছেন ইসলাম।

 

ইতিহাসের দৃষ্টিতে পতিতাবৃত্তির পরিণতি :

 

১️) প্রাচীন রোম ও গ্রিস :

ইতিহাসে দেখা যায়, রোমান সাম্রাজ্যে পতিতাবৃত্তি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। ফলাফল? নৈতিক অবক্ষয়, পরিবার ভাঙন ও পরিণতিতে সভ্যতার পতন।

 

২️) ভারতীয় উপমহাদেশে :

মুঘল আমলে কিছু শহরে পতিতালয় গড়ে উঠলেও, ইসলামি শাসকগণ সেগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিতেন। কারণ তারা জানতেন— এ কাজ সমাজে অশান্তি ও অবিশ্বাস জন্ম দেয়।

 

৩️) আধুনিক বিশ্বে :

আজও পতিতাবৃত্তি বৈধ করা দেশগুলোতে পারিবারিক ভাঙন, ধর্ষণ, যৌন রোগ ও শিশু নির্যাতনের হার বেড়েছে ভয়াবহভাবে।

জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, মানবপাচারের ৮০% অংশ যৌন ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত।

 

সমাজে এর ভয়াবহ প্রভাব :

 

ক) পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে

খ) নারীর মর্যাদা নষ্ট হয়

গ) যৌন অপরাধ বৃদ্ধি পায়

ঘ) শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা বিপথগামী হয়

ঙ) সমাজে অবিশ্বাস ও নৈতিক সংকট জন্ম নেয়

 

ইসলামের সমাধান :

 

ইসলাম পতিতাবৃত্তি বন্ধে শুধু নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, বরং বিকল্প পথও দিয়েছে—

১) দারিদ্র্য বিমোচন ও জাকাত ব্যবস্থা

২) বিয়েকে সহজ ও উৎসাহিত করা

৩) পর্দা ও নৈতিক শিক্ষা

৪) সামাজিক সহানুভূতি ও কর্মসংস্থান

 

মোটকথা, পতিতাবৃত্তি শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো জাতির নৈতিক মৃত্যু ডেকে আনে। ইসলাম এই পেশাকে শুধু হারাম বলেনি, বরং সমাজ থেকে দূর করতে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা দিয়েছে।

মানবতার কল্যাণে, সমাজের পবিত্রতা রক্ষায় — পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব ও ঈমানি দাবি।

 

সংকলক : হা. মুফতি দেলোয়ার হোসাইন মাহদী

 

[ইসলামি আলোচক, মিডিয়া কর্মী, শিক্ষক ও সংগঠক]

সূত্র: আল-কুরআন, সহীহ হাদীস, ইসলামিক ইতিহাস গ্রন্থ ও ইউনেস্কো রিপোর্ট।