তেঁতুলিয়া নদীতে ড্রেজারের দাপট, হুমকির মুখে কোটি টাকার বাঁধ

লেখক: Arisha Eme
প্রকাশ: ২ মাস আগে
তেঁতুলিয়া নদীতে ড্রেজারের দাপট, হুমকির মুখে কোটি টাকার বাঁধ—ভাঙনের আতঙ্কে চরফ্যাশনের হাজারো মানুষ

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার বাবুরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীতে অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। দিনের আলোতেই বিশালাকার ড্রেজার জাহাজ বসিয়ে নদীর বুক চিরে বালু তোলার কারণে তীরবর্তী নদী রক্ষা বাঁধ এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে নদী ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নজরুলনগর ও বিচ্ছিন্ন মুজিবনগর ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ।

রোববার (৮ মার্চ) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নজরুলনগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীতে অন্তত ৭ থেকে ৮টি বড় ড্রেজার জাহাজ দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজারের পাইপ বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলার ফলে নদীর নিচে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে নদী শাসনের জন্য ফেলা কংক্রিট ব্লকগুলো ধীরে ধীরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাবুরহাট ঘাটের মুদি ব্যবসায়ী রিয়াজ, সমাজকর্মী জাহিদসহ একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, তার অনুমতি ছাড়া ওই এলাকায় নদী থেকে এক বালতি বালুও উত্তোলন করা সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ড্রেজার চালক জানান, প্রতিটি ড্রেজার জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে ‘মাসোহারা’ দিতে হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী মাহমুদুল হাসানের বড় ভাই এবং স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহিদুল শিকদার। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এই অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রমকে প্রশাসনিকভাবে আড়াল করছেন বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। এছাড়াও একই ইউনিয়নের যুবদল নেতা রুবেল শিকদার ও তানজিব নামের আরও দুজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্থানীয়রা জানান।

এদিকে বাবুরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন নদী রক্ষা বাঁধ এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আনিসুর রহমান জুলফিকার বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদী শাসনের জন্য ফেলা বড় বড় ব্লকগুলো ধীরে ধীরে নদীর গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী হাসান মুন্সি বলেন, “ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। সামনে বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন তীব্র হলে নজরুলনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান। মুঠোফোনে তিনি বলেন, “বালি উত্তোলনের সঙ্গে আমি জড়িত নই। বরং আমি বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছি।” নদী থেকে তাহলে কারা বালি উত্তোলন করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি নিজেও জানি না কারা বালি তুলছে।”

এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হক বলেন, বাবুরহাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের বিষয়টি তার জানা হয়েছে। যারা এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিতে পারে এবং হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়তে পারে। তাই প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।