পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সীমান্ত সড়ক’: যোগাযোগে নতুন দিগন্ত, বদলে যাবে পাহাড়ের অর্থনীতি

লেখক: Arisha Eme
প্রকাশ: ১ মাস আগে
পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সীমান্ত সড়ক’: যোগাযোগে নতুন দিগন্ত, বদলে যাবে পাহাড়ের অর্থনীতি

পার্বত্য চট্টগ্রাম নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশছোঁয়া পাহাড়, সবুজ বনরাজি এবং অসংখ্য ঝরনা-বেষ্টিত এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত। অপরিসীম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানকার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়, গভীর গিরিখাত, পাহাড়ি নদী ও অসংখ্য ছড়ার কারণে এই অঞ্চলে যাতায়াত সবসময়ই কঠিন ছিল। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দীর্ঘদিন জটিল ছিল। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়েছে।

এই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রাও অনেকাংশে দুর্গমতার কারণে সীমাবদ্ধ ছিল। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে সহজে পৌঁছায়নি। এসব সমস্যার সমাধানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্প ‘সীমান্ত সড়ক’ নির্মাণ কার্যক্রম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ ২০২৫ সালের মধ্যভাগে শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই সড়কটি বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়াও স্পর্শ করেছে, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় নির্মিত সড়ক হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এবং তাদের অধীনস্থ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নসমূহ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে। অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ, প্রতিকূল আবহাওয়া, গভীর গিরিখাত, যোগাযোগ সংকট এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের নানা বাধা সত্ত্বেও সেনাসদস্যরা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের অপতৎপরতার মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের।

প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ উপজেলার মধ্যে আধুনিক সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ সড়ক নেটওয়ার্ক হিসেবে এটি গড়ে উঠবে।

এই সড়কের মূল উপকারভোগী হবে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ। আগে যেসব স্থানে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন দিন পাহাড়ি পথে হেঁটে যেতে হতো, সেখানে এখন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট বা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এতে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও দ্রুত গতিশীল হচ্ছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ঘটবে। আগে দুর্গমতার কারণে অনেক এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কঠিন ছিল এবং দক্ষ শিক্ষকও সেখানে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন। নতুন সড়ক তৈরি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন সহজ হবে এবং শিক্ষার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে সহজেই বিদ্যালয়ে আসতে পারবে। এতে পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন প্রজন্ম উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। দুর্গমতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হতো, যার ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের প্রাণহানি ঘটত। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে দ্রুত রোগী পরিবহন, হাসপাতাল স্থাপন এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ সহজ হবে। দক্ষ চিকিৎসকরাও এখন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সেবা দিতে আগ্রহী হবেন।

এছাড়া এই সড়ক পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষিপণ্য, ফলমূল ও হস্তশিল্প সহজেই দেশের অন্যান্য স্থানে পরিবহন করা যাবে। এতে কৃষক ও উৎপাদকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং নতুন বাজার সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়তা করবে।

সব মিলিয়ে সীমান্ত সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দেশের মূলধারার সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হবে এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

  • পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সীমান্ত সড়ক’: যোগাযোগে নতুন দিগন্ত
  • বদলে যাবে পাহাড়ের অর্থনীতি