
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)-এর মালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছে আটকা পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেও জাহাজটি শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
বিএসসির মালিকানাধীন ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ নামের জাহাজটি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় জাহাজটি পথ পরিবর্তন করে আবার পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যায়। বর্তমানে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা উপকূলের বহির্নোঙর এলাকায় অবস্থান করছে।
এ ঘটনায় জাহাজটির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সহায়তা চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএসসি। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জাহাজটিতে বর্তমানে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন এবং তারা সবাই সুস্থ আছেন।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ম্যারিটাইম ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ বর্তমানে শারজা উপকূলের অদূরে নোঙর করে রয়েছে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে তা জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এর পরদিনই ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালালে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর জাহাজ কর্তৃপক্ষ নতুন পণ্য বহনের পরিকল্পনা বাতিল করে নিরাপদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করলেও পথে নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়ায় জাহাজটি আর অগ্রসর হয়নি।
জাহাজের নাবিকদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ জাহাজটি হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ থেকে প্রায় ৬৬ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছালে ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়। একই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোস্টগার্ডও নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর জাহাজটি পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে।
‘এমভি জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি জাহাজে মিসাইল ও ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত মঙ্গলবার একটি চীনা জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেলেও গত দুই দিনে আর কোনো জাহাজের চলাচল দেখা যায়নি।
তিনি জানান, জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ভারতের মুম্বাই বন্দর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য শারজা বন্দরের অদূরে জাহাজটি নোঙর করে অপেক্ষা করা হচ্ছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল মালেক জানান, জাহাজে থাকা সব নাবিক সুস্থ আছেন এবং তাদের মনোবলও দৃঢ় রয়েছে। জাহাজে পর্যাপ্ত খাবার, সুপেয় পানি এবং জ্বালানি তেল মজুত আছে, যা আগামী কয়েক মাসের জন্য যথেষ্ট। নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় কাতার থেকে নতুন করে পণ্য বহনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে অবস্থানরত বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। ওই হামলায় জাহাজটির প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন এবং পরে আটকে পড়া ২৮ নাবিককে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি তেহরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রণালি ও এর আশপাশে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার দুবাই উপকূলের কাছে ‘সোর্স ব্লেসিং’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।
এদিকে পারস্য উপসাগরে বর্তমানে প্রায় ১১০টি তেলবাহী ট্যাংকারসহ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্ব শিপিং কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জো ক্রামেক জানিয়েছেন, সংঘাতে জড়িত না থাকলেও নাবিকেরা এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন।
