কাবা শরিফের ভেতরে কী আছে? পবিত্র ঘরটির অজানা কিছু তথ্য
বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবা শরিফ। মহান আল্লাহ তাআলার এই ঘরকে ঘিরেই আবর্তিত হয় মুসলিম উম্মাহর নামাজ, হজ ও ইবাদত-বন্দেগি। কাবার বাইরের দৃশ্য সবার পরিচিত হলেও এর ভেতরের পরিবেশ কেমন এবং সেখানে কী কী রয়েছে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
কাবার দরজা বছরে মাত্র দুবার খোলা হয়। সাধারণত ধৌতকরণ অনুষ্ঠান এবং বিশেষ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত, আধ্যাত্মিক ও সরল সৌন্দর্যে ভরপুর। কাবার উচ্চতা প্রায় ১২ থেকে ১৩ মিটার।
ভেতরে ছাদকে ধারণ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে তিনটি শক্ত কাঠের স্তম্ভ রয়েছে। ধারণা করা হয়, এগুলো আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর সময় থেকে স্থাপিত। উন্নতমানের টিক কাঠ দিয়ে তৈরি এসব স্তম্ভ বর্তমানে স্বর্ণখচিত নকশায় সজ্জিত।
কাবার মেঝে ও দেয়ালের নিচের অংশ সাদা ও ধূসর মার্বেল পাথরে আবৃত। দেয়ালের ওপরের অংশে সবুজ রেশমি কাপড়ের প্যানেলে পবিত্র কোরআনের আয়াত স্বর্ণখচিত ক্যালিগ্রাফিতে লেখা রয়েছে। শুরুতে কাবার কোনো ছাদ ছিল না। পরে কুরাইশরা সংস্কারের সময় প্রথম ছাদ নির্মাণ করে এবং পরবর্তীতে কাঠামো আরও মজবুত করতে আরেকটি অতিরিক্ত ছাদ যুক্ত করা হয়।
কাবার ভেতরে প্রবেশের পর ডান পাশে একটি ছোট সোনালি দরজা দেখা যায়, যাকে বলা হয় ‘বাবুত তাওবা’। এটি মূলত ছাদে ওঠার সিঁড়ির প্রবেশপথ। এছাড়া ভেতরে বিভিন্ন যুগের ঐতিহাসিক মশাল, পিদিম ও প্রদীপ ঝোলানো রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন মুসলিম শাসক ও বাদশাহ উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।
কাবার অভ্যন্তরে একটি বিশেষ স্থান রয়েছে, যেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর নামাজ আদায় করেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে যেকোনো দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করা যায়।
ভেতরে একটি মার্বেল পাথরের তৈরি বিশেষ স্থান রয়েছে, যেখানে উদ, কস্তুরি ও গোলাপজলের মতো সুগন্ধি রাখা হয়। এছাড়া দেয়ালে বিভিন্ন যুগের খলিফা ও বাদশাহদের নামসংবলিত মার্বেল ফলকও রয়েছে, যারা বিভিন্ন সময়ে কাবা সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন।
বর্তমান কাবার দরজাটি ১৯৭৭ সালে সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের নির্দেশে নির্মিত হয়। এতে প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে কাবার বাইরের কালো গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় প্রায় ৬৭০ কেজি রেশম ও ১৫ কেজি সোনার সুতা। প্রতি বছর নতুন গিলাফে পবিত্র কোরআনের আয়াত সূচিকর্মের মাধ্যমে লেখা হয়।
পবিত্র কাবা পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হয় জমজমের পানি, গোলাপজল ও বিশেষ সুগন্ধি। খেজুর পাতার ব্রাশ ও কোমল কাপড় দিয়ে অত্যন্ত যত্নসহকারে এর দেয়াল ও মেঝে পরিষ্কার করা হয়।
সব মিলিয়ে, কাবা শরিফের অভ্যন্তরে নেই কোনো বাহ্যিক জাঁকজমক; বরং রয়েছে সরলতা, পবিত্রতা ও গভীর আধ্যাত্মিক আবহ। এটি মুসলিম উম্মাহর কাছে শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং ঈমান, ইতিহাস ও ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক।
