সাড়ে ৩০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী সুখাইড় জমিদারবাড়ি

51269
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ঐতিহাসিক সুখাইড় জমিদারবাড়ি। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে নানা ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী এই স্থাপনা আজ কালের বিবর্তনে জীর্ণ হয়ে পড়েছে। উপযুক্ত সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়কার দৃষ্টিনন্দন এই রাজবাড়ি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাসপ্রেমী ও সচেতন মহলের মতে, সুখাইড় জমিদারবাড়ি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি হাওরাঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে কয়েক শত বছরের এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারিয়ে যেতে পারে।

মোগল আমলে যাত্রা: স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল শাসনামলে ১৬৯১ সালে মহামাণিক্য দত্ত রায় চৌধুরী হুগলি থেকে আসাম যাওয়ার পথে সুখাইড় এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। পরে তিনি এখানে জমি ক্রয় করেন। ১৬৯৫ সালে জমিদার মোহনলাল প্রায় ২৫ একর জায়গাজুড়ে জমিদারবাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

একসময় সুখাইড় জমিদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল বিস্তৃত। গজারিয়া নদীর উত্তর পাড় থেকে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি ও প্রভাব বিস্তৃত ছিল বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। স্থাপত্যের বৈচিত্র্য, বিশাল প্রাঙ্গণ ও নির্মাণশৈলীর কারণে বাড়িটি একসময় হাওরাঞ্চলে ‘রাজমহল’ নামে পরিচিত ছিল।

হারিয়ে যাচ্ছে স্থাপত্যের জৌলুস: জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু আগে। সময়ের পরিক্রমায় জমিদারদের সেই ক্ষমতা ও প্রভাবও হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্থাপত্য এখনো সুখাইড়ের অতীতের গল্প বলে।

জমিদারবাড়ির মূল আঙিনার চার ভাগের মধ্যে বড়বাড়ি, মধ্যমবাড়ি ও ছোটবাড়ি এখনো কোনো রকমে টিকে আছে। পাশাপাশি রয়েছে বাংলোঘর, কাছারিঘর, জলসাঘর, গুদামঘর ও খাসকামরার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা। তবে দীর্ঘদিনের অযত্নে এসব স্থাপনার অনেকগুলোই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও ছাদ ও পলেস্তারা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রকৃতির বিরূপতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে স্থাপত্যের পুরোনো জৌলুস।

জমিদারের বিশাল জলমহাল: সুখাইড় জমিদারদের প্রভাব শুধু জমিদারবাড়ির আঙিনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁদের অধীনে ছিল ধানকুনিয়া বিল, চারদা বিল, কাইমের দাইড়, সোনামোড়ল, পাগুয়া, ছাতিধরা, ধারাম, রাকলা, বৌলাই ও নোয়া নদীসহ প্রায় ২০টি বড় জলমহাল।

প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনা, হাওরের মৎস্যসম্পদ ও বনজসম্পদ ছিল জমিদারদের আয়ের অন্যতম উৎস। ফলে সুখাইড় জমিদারবাড়ি ছিল শুধু আবাসস্থল নয়; বরং তৎকালীন হাওরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের সেই গল্প: সুখাইড় জমিদারবাড়িকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একবার বেলেন্টিয়ার সুখাইড় জমিদারবাড়িতে আসেন। পরে হাতিতে চড়ে পাশের টাঙ্গুয়ার হাওরে শিকারে গেলে তিনটি বাঘ তাঁকে আক্রমণ করে। এ সময় তৎকালীন জমিদার মথুর চৌধুরী সাহসিকতার সঙ্গে গুলি করে বাঘগুলো হত্যা করেন এবং ইংরেজ প্রশাসককে বাঁচান।

জনশ্রুতি আরও রয়েছে, পরে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে বেলেন্টিয়ার নিজের ব্যবহৃত একটি রাইফেল জমিদারকে উপহার দেন। তবে এসব ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রামাণ্য নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন।

নানকার বিদ্রোহের স্মৃতি: সুখাইড় জমিদারবাড়ির সঙ্গে ১৯২২-২৩ সালের নানকার বিদ্রোহের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়। জমিদারি প্রথার শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে এ অঞ্চল সম্পর্কিত ছিল বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।

তাই সুখাইড় জমিদারবাড়ির গুরুত্ব শুধু স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, জমিদারি প্রথা এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ইতিহাসও।

মাটির নিচে কি লুকিয়ে আছে অতীতের নিদর্শন?:  স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের ধারণা, জমিদারবাড়ির মাটির নিচে এখনো প্রাচীন স্থাপত্য ও নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চাপা পড়ে থাকতে পারে। পরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান চালানো হলে এসব নিদর্শন উদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে স্থানটি মূল্যায়ন করা গেলে সুখাইড়ের অতীত সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্য গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল এমনিতেই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। এর সঙ্গে কয়েক শত বছরের পুরোনো সুখাইড় জমিদারবাড়ির ইতিহাস যুক্ত হওয়ায় পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।

স্থানীয়দের মতে, জমিদারবাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ, সংস্কার ও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

হারিয়ে যাওয়ার আগে সংরক্ষণ জরুরি: সুখাইড় জমিদারবাড়ি সময়ের কাছে শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি হাওরাঞ্চলের কয়েক শত বছরের ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান দলিল। এর প্রতিটি দেয়াল, প্রাঙ্গণ ও জরাজীর্ণ স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের গল্প।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই স্মারককে যদি এখনই সংরক্ষণ করা যায়, তবে একদিকে যেমন হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্যের অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে তাদের এলাকার অতীত ইতিহাস।

সুখাইড় জমিদারবাড়ি তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি হাওরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের ক্ষয় ও অবহেলার কাছে সেই ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, সংরক্ষণ ও সংস্কার।

জমিদারবাড়ির বর্তমান বংশধর মোহন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীরা এই বাড়িটি দেখতে আসেন। কিন্তু বিশাল এই স্থাপত্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও কারিগরি সক্ষমতা আমাদের নেই। সরকারি উদ্যোগে বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা হলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।’

ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, ‘সুখাইড় জমিদারবাড়ি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। জমিদারবাড়িটি সংস্কারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগও বিষয়টি অবগত আছে।’

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ