বাংলাদেশ ডেস্ক: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২০ অপরাহ্ন
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (এনএইচএস) অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি) আক্রান্ত রোগীদের আনুষ্ঠানিক ডায়াগনসিস বা রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া সীমিত করার পরিকল্পনার ওপর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রস্তাবকে স্বাস্থ্যসেবার ‘রেশন ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে নিজেদের রোগ নির্ণয়ে বাধ্য করবে।
আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাজ্য সরকারের একটি পর্যালোচনায় জানা যাবে, এডিএইচডি উপসর্গ থাকা রোগীদের আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ নির্ণয় করা হবে না। এর পরিবর্তে রোগীদের ‘ট্রায়াজ’ বা প্রাথমিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে এবং আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয় ছাড়াই সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হবে। দ্য টাইমসে প্রথম প্রকাশিত এই প্রস্তাবিত ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো এনএইচএস-এর সুবিধাগুলোকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দিকে নিয়ে যাওয়া, যেমন যারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন বা কাজ করতে অক্ষম।
কমিশন করা এই পর্যালোচনার প্রতিবেদনে বলা হবে, যারা কম জটিলতায় ভুগছেন, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এনএইচএস ক্লিনিকে রেফার করা নাও হতে পারে। তবে একটি সমন্বিত অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য প্রদান করা হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, অটিজম ও এডিএইচডির প্রকোপ এবং এ সংক্রান্ত সুবিধা বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ থেকে গত ডিসেম্বরে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সাইকোঅ্যানালিস্ট অধ্যাপক পিটার ফোনাগির নেতৃত্বে পরিচালিত এই পর্যালোচনার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান ব্যবস্থাটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কেবল প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার জন্যই আনুষ্ঠানিক ডায়াগনসিস পেতে বাধ্য করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এনএইচএস-এর অপেক্ষমাণ তালিকায় বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ মানুষ চিকিৎসকের মূল্যায়নের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে অটিজম ও এডিএইচডি সেবা নিয়ে অভিযোগ পাঁচ বছরে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ বা কর্মক্ষেত্রে নেই এমন এডিএইচডি আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ মানুষ তাদের শারীরিক অবস্থার কারণে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল। এডিএইচডি টাস্কফোর্সের হিসাবে, অনিরূপিত ও চিকিৎসাবিহীন এডিএইচডির কারণে প্রতি বছর ১৭ বিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
ফোনাগির পর্যালোচনায় সুপারিশ করা হচ্ছে যে, যাদের চিকিৎসার জন্য ওষুধের প্রয়োজন বা যারা ডায়াগনসিস থেকে সরাসরি উপকৃত হবেন, কেবল তাদেরই এডিএইচডি ক্লিনিকে পাঠানো উচিত। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় রোগীদের বিদ্যালয়, কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সহায়তার মধ্যে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সাহায্য, স্কুলে শান্ত ঘর, অভিভাবকদের জন্য নির্দেশনামূলক ক্লাস এবং কর্মক্ষেত্রে নমনীয় কাজের সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে কার্যত স্বাস্থ্যসেবাকে সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ নির্ণয় করা না হলেও স্কুল ও কর্মক্ষেত্রগুলো আগেই প্রাথমিক সহায়তা প্রদান করতে পারতো। এডিএইচডি ইউকে-এর প্রধান নির্বাহী হেনরি শেলফোর্ড এই পর্যালোচনার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘মাইন্ড’ বা সাধারণ বলতে কোনো এডিএইচডি হয় না। শারীরিক ও মানসিক জীবনে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ পেলেই কেবল ডায়াগনসিস করা হয়। তিনি আরও সতর্ক করেন, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বন্ধ হলে মানুষ টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর করে স্ব-রোগ নির্ণয় করতে বাধ্য হবে।
ন্যাশনাল অটিস্টিক সোসাইটির নীতি ও প্রভাব বিস্তার বিষয়ক প্রধান মেল মেরিট জানিয়েছেন, মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হলে অটিজম এবং এডিএইচডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বৈষম্য আরও বাড়বে। অন্যদিকে, সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ-এর প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বেল বলেন, সঠিক চিকিৎসা পেতে ডায়াগনসিস খুবই সহায়ক। তবে মূল্যায়নের অপেক্ষায় কাউকে যেন সঠিক মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত রাখা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের এক মুখপাত্র আসন্ন প্রতিবেদনটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য না করে জানিয়েছেন, অধ্যাপক পিটার ফোনাগির নেতৃত্বাধীন স্বাধীন পর্যালোচনা দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি শিগগিরই প্রকাশিত হবে এবং এটি সরকারের নতুন জাতীয় নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।