ফিচার ডেস্ক: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২০ অপরাহ্ন
টাঙ্গাইল শহরের কোলাহল পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই ইতিহাস আর স্মৃতির মেলবন্ধন দেখা যায় সন্তোষে। ব্রিটিশ শাসনের আগে এই স্থানটি ‘খোশনদপুর’ নামে পরিচিত ছিল। কেবল জমিদারবাড়ির স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা, জনকল্যাণ এবং রাজনীতির নানাবিধ অধ্যায়ে সন্তোষের নাম ইতিহাসজুড়ে রয়েছে, যার কেন্দ্রে ছিলেন এক দূরদর্শী নারী শ্রীমতী জাহ্নবী চৌধুরাণী।
মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে ও ১৩ বছর বয়সে বিধবা হওয়া জাহ্নবী চৌধুরাণী স্বামীর মৃত্যুর পর জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিজের জমিদারির দরিদ্র প্রজাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন। ১৮৭০ সালের ৩ জুন নিজ বসতবাড়ির আঙিনায় প্রায় সাড়ে চার একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয়। প্রথম দিকে শণের ঘরে কাজ শুরু হলেও পরে তা বিশাল শিক্ষাঙ্গনে রূপ নেয়। তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার দ্বিতীয় এবং বর্তমান টাঙ্গাইলের প্রাচীনতম এই উচ্চবিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার জন্য পাঠাগার ও বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়, যেখানে ৩৬ খণ্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাসহ দুষ্প্রাপ্য বই ও সরঞ্জাম ছিল।
বিদ্যালয়ের সামনে ১৮৭৩ সালে বিখ্যাত পি সি সেন এমএয়ের সহযোগিতায় একটি সূর্যঘড়ি তৈরি করা হয়, যা ছায়া মেপে সময় জানার অভিনব ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি ১০১টি বিশাল দরজাওয়ালা জানালাবিহীন প্রাসাদোপম দীর্ঘ ভবন নির্মাণ করা হয়, যা আজও এখানকার বড় আকর্ষণ।
শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবায়ও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন জাহ্নবী চৌধুরাণী। তিনি সন্তোষে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময়ে যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র বা টিবি ক্লিনিক হিসেবে পরিচিত লাভ করে। নব্য ধ্রুপদি বা ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতির করিন্থীয় ধাঁচের স্তম্ভশীর্ষ এবং কারুকার্যময় কার্নিশসমৃদ্ধ এই ঐতিহাসিক ভবনে আজ ১৫০ বছর পরেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে যক্ষ্মার চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে এবং এটি ২৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালের অংশ।
সন্তোষের স্থাপনা নির্মাণের জন্য মাটি কাটতে গিয়ে ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের আকৃতিতে বিশাল একটি জলাশয় তৈরি হয়, যা ‘টি পন্ড’ নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয় মানুষের সুপেয় পানির প্রয়োজন মেটাতেও এই পুকুর ব্যবহার করা হতো।
জাহ্নবী চৌধুরাণীর পর তাঁর পুত্রবধু রানি দিনমণি রায় চৌধুরাণীও জনকল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখেন। তিনি দার্জিলিংয়ে স্বামীর নামে বৈকুণ্ঠনাথ থায়সিস ওয়ার্ড, ঢাকায় বৈকুণ্ঠনাথ আশ্রম, মিটফোর্ড হাসপাতালে নারী ওয়ার্ড এবং কাগমারীতে রানি দিনমণি মহাশ্মশান ঘাট ও দাতব্য কাঠের ভান্ডার প্রতিষ্ঠা করেন।
সন্তোষের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ক্রীড়া ইতিহাসেরও গভীর সংযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম হয়েছিল এই সন্তোষের মাটিতে। অন্যদিকে সন্তোষের জমিদার এবং ভারতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরীর সম্মানার্থে ভারতে আজ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ‘সন্তোষ ট্রফি’ ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়ে আসছে। তাঁতের শাড়ি ও মিষ্টির বাইরে সন্তোষের ঐতিহাসিক স্মৃতিমালা টাঙ্গাইলকে এক অনন্য পরিচয়ে তুলে ধরে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।