নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। বিশ্বের নানা প্রান্তের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, শান্তি, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন সেই বিশ্বমঞ্চে বাংলায় কথা বলল বাংলাদেশ।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে এটিই তাঁর প্রথম ভাষণ।
প্রায় ২১ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকট, ফিলিস্তিন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিষয় তুলে ধরেন।
বাংলায় বক্তব্য—নিজস্ব পরিচয়ের প্রকাশ
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চগুলোর একটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। সেখানে বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছে।
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
কেমন বাংলাদেশ চায় সরকার
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। তাঁর বক্তব্যে দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র, জনগণের অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
দেশ পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে তিনি সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন কৌশলের কথাও তুলে ধরেন। অর্থাৎ পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট—আন্তর্জাতিক সমাধানের আহ্বান
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক সংকট রোহিঙ্গা ইস্যু। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এই সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু বাংলাদেশের একার দায়িত্ব নয়—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন—জাতিসংঘের মঞ্চে সেই বার্তাই আবারও সামনে এসেছে।
ফিলিস্তিন ও বিশ্বশান্তির প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ফিলিস্তিনের মানুষের অধিকার ও শান্তির বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সমাধান, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক দায়
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো—জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান তুলনামূলক কম হলেও এর ক্ষতির ঝুঁকি বেশি। ফলে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ও মানবিক বিষয়ও।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা কী?
প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণকে কয়েকটি মূল বার্তায় দেখা যায়—
প্রথমত, বাংলাদেশ তার নিজস্ব ভাষায় বিশ্ববাসীর সঙ্গে কথা বলতে চায়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ গণতন্ত্র, জনগণের ক্ষমতায়ন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা সামনে আনছে।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
চতুর্থত, ফিলিস্তিনসহ বিশ্বজুড়ে শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এসেছে।
ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়
এ ভাষণের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক হলো—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একই মঞ্চে একই পরিবারের তিন সদস্যের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা।
এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন। তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের এই মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার ধারাবাহিকতা পূর্ণ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুধু একটি রাষ্ট্রীয় বক্তব্য নয়; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাষা, রাষ্ট্রীয় প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।