ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে রাজকীয় বিদায় জানানো হয়েছে দেবগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তীকে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায়ী অনুষ্ঠানে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন অলক কুমার চক্রবর্তী। তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ ও পরিচিত আঙিনাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কর্মজীবনের অসংখ্য স্মৃতি। অবসরের দিনে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায়ের আয়োজন সেই স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে সবার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।
বিদায়ী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কুমিল্লা অঞ্চলের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম, আখাউড়ার একাডেমিক সুপারভাইজার কফিল উদ্দিন মাহমুদসহ অন্যরা।
অলক কুমার চক্রবর্তীর বিদায় আয়োজনে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্যের আবেগও। তাঁর বাবা অরুণ চক্রবর্তীও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বাবার পথ অনুসরণ করে ছেলের দীর্ঘ শিক্ষকতা—একই পরিবারের দুই প্রজন্মের সঙ্গে বিদ্যালয়টির এই সম্পর্ক বিদায়ের মুহূর্তকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
একসময় গ্রামবাংলার বিয়ে ও নানা সামাজিক আয়োজনে ঘোড়ার গাড়ি ছিল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আধুনিক যানবাহনের প্রসারে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই বিরল। এমন সময়ে একজন শিক্ষককে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানোর আয়োজন পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তবে আয়োজনের মূল আকর্ষণ শুধু ঘোড়ার গাড়ি নয়, বরং একজন শিক্ষকের প্রতি দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান।
এমন ব্যতিক্রমী বিদায়ে আবেগাপ্লুত অলক কুমার চক্রবর্তী বলেন, “আমি খুবই আনন্দিত। সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল।”
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, “চাকরিজীবীরা অবসরে গেলে সাবেক হয়ে যান। শিক্ষক কিন্তু শিক্ষকই থাকেন। বিদায়বেলায় শিক্ষকের এমন রাজকীয় বিদায় সত্যিই আনন্দের। একজন শিক্ষক পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি গর্ববোধ করছি।”
দীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মজীবন শেষে ঘোড়ার গাড়িতে এই বিদায় শুধু একজন শিক্ষকের অবসরকে স্মরণীয় করে রাখেনি, বরং শিক্ষার্থীদের জীবনে আলো ছড়ানো মানুষগুলোর প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক আবেগঘন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।