আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ন
কেনিয়ার একটি আদালত একটি প্রলয়ঙ্করী বা ধ্বংসাত্মক ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধান পল ম্যাকেনজিকে ১৯১ জনকে হত্যার দায়ে ২০০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। নিহতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিল শিশু। ম্যাকেনজির পাশাপাশি তার আরও ২৭ জন অনুসারীকেও এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তারা তাদের ধর্মীয় অনুসারীদের নিজ সন্তানদের অভুক্ত রেখে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে তারা “যিশুর সঙ্গে সাক্ষাৎ” করতে পারে।
স্বঘোষিত এই যাজককে ২০২৩ সালে গ্রেফতার করা হয়। কেনিয়ার উপকূলের কাছে শাকাহোলা জঙ্গলে অগভীর গণকবর থেকে ৪০০টিরও বেশি মরদেহ উদ্ধারের পর এই নৃশংসতার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনাটি সমগ্র কেনিয়াকে স্তব্ধ করে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মোম্বাসার আদালতে রায়ের আগে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অপরাধের ভয়াবহতার কারণে ম্যাকেনজির মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন। তারা আদালতকে জানান, ম্যাকেনজি তার কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। পাশাপাশি তার সহযোগী আসামীদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন জানানো হয়। অন্যদিকে, ম্যাকেনজি এবং তার সহযোগীরা আদালতের কাছে ক্ষমা এবং অনুকম্পা প্রার্থনা করেছিলেন। এর আগে ১৯ অক্টোবরের সাজা ঘোষণার আগে তারা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন এবং বলেন যে কাউকে মরতে বাধ্য করা হয়নি।
গত মাসে আট ঘণ্টাব্যাপী দেওয়া রায়ে বিচারক ডায়ানা মোচাকে উল্লেখ করেন, ম্যাকেনজির অনুসারীরা বিশ্বাস করত যে সে ছিল “যিশুর মুখপাত্র”। যারা তার মতবাদের বিরোধিতা করত, তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হতো। এমনকি তার এক সহযোগী জানায়, অনাহারের নির্দেশ অমান্যকারীদের লাথি ও ঘুষি মেরে “জোর করে স্বর্গে পাঠানোর” নিয়ম চালু করা হয়েছিল।
বিচারক জানান, শাকাহোলা জঙ্গলের ভেতরে হওয়া এই মৃত্যুগুলোকে “বিয়ে” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো এবং যারা মারা যেত, তারা “যিশুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে” বলে উদযাপন করা হতো। বিচারক পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই মৃত্যুগুলো একটি সংগঠিত ধর্মীয় মতবাদ ও নির্দেশের ফল, যা অনুসারীদের প্রাণঘাতী উপবাসে বাধ্য করেছিল।
ময়নাতদন্তের ফলাফলে দেখা গেছে, বেশিরভাগ শিকারের মৃত্যু হয়েছিল অনাহারে। তবে কিছু মানুষ শ্বাসরোধে, গলা টিপে এবং মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যায়। কিছু মৃতদেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি, আবার অনেকে উদ্ধারের পরপরই চরম কৃশতার কারণে মারা যায়।
শাকাহোলা জঙ্গলের এই ঘটনা কেনিয়ায় ভুয়া ধর্মীয় কার্যক্রম ও তদারকির অভাবকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন, যদিও পরবর্তীতে তা অসংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কেনিয়া ন্যাশনাল কমিশন অন হিউম্যান রাইটস (KNCHR)-এর তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এই গোষ্ঠীর কার্যালাপ দেখেও না দেখার ভান করেছেন।
পল ম্যাকেনজি ২০০৩ সালে ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী ১৬ বছরে এটি বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং কেনিয়াজুড়ে এর শাখা বিস্তৃত হয়। ম্যাকেনজি একটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তার ধর্মোপদেশ প্রচার করতেন। তার বক্তব্যে শিক্ষা, আধুনিক চিকিৎসা এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রের বিরুদ্ধে কট্টর মতামত দেওয়া হতো। ২০১৯ সালে মূল গির্জা বন্ধ করে তিনি শাকাহোলা জঙ্গলে স্থানান্তরিত হন এবং অনুসারীদের তার সাথে আসার আহ্বান জানান।
বর্তমানে হত্যা মামলার এই রায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের জন্য খানিকটা বিচার এনে দিলেও, জঙ্গলে ৪০০টিরও বেশি লাশ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে মাত্র ১৯১টি মৃত্যুর নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া ম্যাকেনজি ও তার সহযোগীরা এখনো সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ছড়ানো এবং শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার মতো অন্যান্য মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।