আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল : বাংলা সংগীতের এক কিংবদন্তির মহাপ্রয়াণ

লেখক:
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

বাংলা সংগীতের কিংবদন্তি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের আজ সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে দেখতেই তার মৃত্যুর সাতটি বছর হয়ে গেল! আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন বাংলাদেশের একজন গুণী সংগীত ব্যক্তিত্ব; যিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। ১৯৭০—এর দশকের শেষ লগ্ন থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পসহ দেশাত্মবোধক এবং আধুনিক সংগীতের উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে সময় পাকবাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা কারাগার, দানা মিয়ার টর্চারসেল, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং রমনা থানায় অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে ভাগ্যক্রমে জীবিত ফিরেন।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল দেশ স্বাধীনের পরে ভগ্নহৃদয়ে গিটার হাতে তুলে নেন। পরে একের পর এক দেশাত্মবোধক, চলচ্চিত্র এবং আধুনিক গানের সুর ও গীত রচনা করে বাংলা সংগীতকে পৌঁছে দেন অনন্য উচ্চতায়।সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কার—সহ অন্যান্য অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ব্যক্তি জীবনে এই মানুষটা ছিলেন অত্যন্ত সরল আর শিশুমনা। অনেকটা গাছ—মানুষ যাকে বলে। দেশ আর দেশের খেটে—খাওয়া মানুষদের নিয়ে খুব চিন্তা করতেন ।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : জন্ম : ১ জানুয়ারি, ১৯৫৬, ঢাকা। মা : ইফফাত আরা নাজিমুন্নেসা বাবা : ওয়াফিজ উদ্দিন আহমেদ (উপ—সচিব, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৮৬ সালে অবসরে যান।) ভাইবোন : ১. ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ (টুলটুল) (ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা।) ২. আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল (ইয়ং প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা।) ৩. রোখসানা তানজিম মুকুল ৪. রোয়েনা হাসান মিটুল  ৫. আহমেদ মিরাজ সন্তান : সামির ইমতিয়াজ মন নানা : হেলাল উদ্দিন আহমেদ (হুগলি জেলার চন্দননগর শহরের প্রখ্যাত শিক্ষক পণ্ডিত ও জমিদার বাবু হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।)
নানি : হোসনে আরা নাজিমুন্নেসা খালা : ইসমাত আরা নাজিমুন্নেসা (ষাটের দশকের প্রখ্যাত নজরুলসংগীত শিল্পী।) মামা : আনসার উদ্দিন আহমেদ (প্রখ্যাত আইনজীবী।) মামি : গুলশান আরা বেগম (অধ্যাপক (অব.), পুরানা পল্টন মহিলা কলেজ, ঢাকা।) দাদা : এরাদ উল্লাহ পাটোয়ারী

শৈশব ও কৈশোর : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের খালা প্রখ্যাত নজরুলসংগীত শিল্পী ইসমাত আরা থেকে শৈশবেই সংগীতের প্রাথমিক হাতেখড়ি ও দীক্ষা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই খুব শান্ত আর লাজুক স্বভাবের ছিলেন। উদ্যমতা, প্রখর, স্মৃতিশক্তি আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মেলে শিশুকাল থেকেই। বড় হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নয়; খালামণির মতো গান করবেন এটাই ছিল তার শৈশব ও কৈশোরকালীন স্বপ্ন। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত নানাবাড়িতে বেশি সময় কেটেছে। নানার নয়াপল্টনের (বাগানবাড়ি) বাসা ছিল সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। তিনি আজিমপুর কিন্ডারগার্টেনে (বর্তমানে অগ্রণী স্কুল) স্ট্যান্ডার্ড ফাইভ পর্যন্ত ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর থেকে বুলবুল যেন আর ঘরে থাকতে পারছিলেন না। বন্ধুদের নিয়ে ঢাকার নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গোপন হামলা পরিচালনা করেন। একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী তন্তর নামক স্থানে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। সেখান থেকে দানা মিয়ার টর্সার সেল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন মহকুমা কারাগারে অসংখ্যবার নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। সেখান থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরতে পারলেও কিছুদিন পর ঢাকার আজিমপুর বাসা থেকে মধ্যরাতে আবারও গ্রেপ্তার হন। পরে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে রমনা থানা হাজত থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলখানায় মুক্তিযোদ্ধাদের গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষীও ছিলেন।WhatsApp Image 2026 01 23 at 3.03.29 PM

স্বাধীন দেশে গিটার হাতে : ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ দেশ স্বাধীনের পরে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৭২ সালে আজিমপুরের ওয়েষ্ট এন্ড হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। পরে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ সম্পন্ন করেন। তখন ৭৩/৭৪ সালের দিকে ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর সাথে কাজ করেন গিটার বাদক হিসেবে। পরে ‘আলাউদ্দিন অর্কেস্ট্রা’ নামের একটি দলের সাথে যুক্ত হন। ওই দলে শেখ সাদী খান, তানসেন খান এবং আব্দুর রহমান বাশুরীসহ ব্রাহ্মবাড়িয়ার একাধিক সদস্য ছিলেন। পরে আলাউদ্দিন অর্কেস্ট্রায় যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন। এছাড়া সহ্য সাহা, আনোয়ার পারভেজ, আলম খান এবং আজাদ রহমানের সাথেও কাজ করেন।

প্রথম সুরারোপ :সুরকার হিসেবে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের প্রথম সুরারোপিত গান ‘গীতি তুমি কেমন আছো’ এবং ‘ও আমার আট কোটি ফুল’ গান দুটি লিখেছিলেন যথাক্রমে এসএম হেদায়েত এবং নজরুল ইসলাম বাবু। পরে ৭৬/৭৭ সালের দিকে সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়ে গাওয়ানো নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল’, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, এসএম হেদায়েতের ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবো না’, মনিরুজ্জামান মনিরের ‘একতারা লাগে না আমার, দোতারাও লাগে না’সহ অসংখ্য গান শ্রোতাপ্রিয় হয়, মানুষের মনে গেথে যায়। পরবর্তীতে দেশাত্মবোধক, চলচ্চিত্র এবং বিভিন্ন অ্যালবামের জন্য প্রায় ৩ হাজারের অধিক গান রচনা ও সুর করেন। যেগুলোর অধিকাংশই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।প্রথম সংগীত পরিচালনা :Screenshot 2026 01 23 191004 ১৯৭৮ সালে ‘নাগরদোলা’ ছবিতে আলাউদ্দিন আলীর সাথে যৌথ সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা ‘অন্তর আমার করলাম নোঙর’ এবং নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘ও আমার মন কান্দে, ও আমার প্রাণ কান্দে’ গান দুটিতে তিনি সুর ও সংগীতের কাজ করেন। পরে কাজী নূরুল হকের পরিচালনায় ১৯৮৩ সালে ‘মেঘ বিজলী বাদল’ ছবিতে পূর্ণাঙ্গ সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তীতে চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, আখি মিলন, নয়নের আলো ইত্যাদি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে নিজেকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছান। পর্যায়ক্রমে গানের কথা, সুর, সংগীত পরিচালনা এবং আবহ সংগীতে বাংলা চলচ্চিত্রে একটি নিজস্ব ধারা তৈরি করতে সক্ষম হন; যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সংগীত বিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’ এর প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেছেন অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে। তিনি প্রায় তিন হাজারের বেশি গানের কথা ও সুরারোপে কাজ করেছেন।প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : ২০০১ সালে গাজী মাহবুবের পরিচালনায় ‘প্রেমের তাজমহল’ চলচ্চিত্রে ‘শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক’ ক্যাটাগরিতে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা : ১. একুশে পদক—২০১০ (সুরকার : সবক’টা জানালা খুলে দাও না…) ২. সশস্ত্র বাহিনী দিবস—১৯৮৯ সম্মাননা (বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, রাষ্ট্রপতির সচিবালয়, সুপ্রীম কমান্ড হেডকোয়ার্টারস।)  ৩. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—২০০১ (শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক : প্রেমের তাজমহল পরিচালক : গাজী মাহবুব)
৪. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—২০০৫ (শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক : হাজার বছর ধরে পরিচালক : কোহিনুর আক্তার সুচন্দা) ৫. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—১৯৯৫) শ্রেষ্ঠ গীতিকার ৬. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—১৯৯৫) শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ৭. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—১৯৯৯) শ্রেষ্ঠ গীতিকার ৮. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—২০০১) শ্রেষ্ঠ গীতিকার ৯. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—২০০২) শ্রেষ্ঠ গীতিকার ১০. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস—২০০২) শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ১১. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি—১৯৯৪ শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ১২. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি—১৯৯৫ শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ১৩. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি—১৯৯৮ শ্রেষ্ঠ গীতিকার ১৪. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি—২০০২ শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক এছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, ফাউন্ডেশন ও সংস্থা কতৃর্ক শতাধিক পদক, স্মারক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

জীবনের শেষ দিনগুলো : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপাদমস্তক একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তাঁর মমতা আর ভালোবাসা ছিল অনন্য উচ্চতার। মৃদুভাষী, নিয়মতান্ত্রিকতা, সহমর্মিতা, আতিথেয়তা, পরোপকারী, সততা, দেশাত্মবোধ এমনই হাজারো গুণ আর বৈশিষ্ট্যে অলংকৃত ছিলেন তিনি। জীবনের একটি বড় অংশ জ্ঞানার্জন আর সাধনায় মগ্ন থেকে কাটিয়েছেন। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায়ও ছিল তাঁর বিশেষ পাণ্ডিত্য। নিজের কর্মব্যস্ততার পাশাপাশি ‘সার্কেল অব সিক্সটিন’ শিরোনামে বিশ্বসংগীতের উৎপত্তি ও ইতিহাস নিয়ে প্রায় ১৫০০ পৃষ্ঠার একটি বই রচনার কাজ করে গেছেন। এ বইটিতে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীতকে একটি সূত্রে এনে সংগীতকে অত্যন্ত সহজ ও প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। টানা ৭/৮ বছর ধরে এ বইটির পেছনে সময়, শ্রম, মেধা ও অর্থ ব্যয় করে গেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা আর নানান জটিলতায় ইংরেজি ভাষায় লেখা এ দুর্লভ গবেষণাধর্মী বইটি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।ইমতিয়াজ বুলবুল
.২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—১ আদালতে নিজের যুদ্ধদিনের স্মৃতি বর্ণনা করেন। সরকার তার এই জবানবন্দিকে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত গোলাম আযমের মামলার সাক্ষী হিসেবে রেকর্ড করে। যদিও তিনি সেখানে শুধুই নিজের যুদ্ধদিনের পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে গোলাম আযমের নাম কিংবা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কোনো বর্ণনা দেননি। তার এই বক্তব্যকে সারা দেশের মিডিয়া গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবেই প্রচার করেছে। এভাবে প্রচারের বিষয়গুলো তার নজরে আসলে তিনি মিডিয়া হাউজের দু—একজনকে ডেকে এনে প্রতিবাদ করলেও তারা নিরুত্তর থেকেছেন। পরে সরকার থেকে বলা হয়েছে তিনি যেন এ ব্যাপারে বেশি কিছু আর না বলেন। পরের বছর ৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে ছোটভাই আহমেদ মিরাজ দুবৃর্ত্তদের হাতে নিহত হন। এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন এবং অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। এরপর থেকে পুলিশি পাহারায় চলতে থাকে নিজ ঘরেই শঙ্খনীল জীবন। তখন থেকে জরুরি কাজ বা খুব প্রয়োজন ব্যতীত বাহিরে বের হতেন না। নিজে বাদী হয়ে ভাইয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার আশায় মামলা করেন। কিন্তু তিনি জীবদ্দশাতেই বারবার তাগাদা দেওয়ার পরেও অদ্যাবধি এই মামলার ফাইনাল রিপোর্ট আসেনি। একদিন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘স্যার, এই মুহূর্তে সরকার থেকে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ক্ষমা করবেন স্যার। আপনাকে অনুরোধ করে বলছি, আপনার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে। আপনিও আর এ বিষয়ে বেশি কিছু জানতে চাইবেন না।’ এসব শুনে তিনি খুব আতঙ্কিতবোধ করেন এবং এক পর্যায়ে তিনি সরকারের পক্ষ থেকেই যেন নিজের জীবনকে অনিরাপদ বোধ করতে থাকেন; যা নিয়ে তিনি আর কখনো বাইরে আলোচনার সাহস পাননি। মাঝে মধ্যে একান্ত আপনজনদের কাছে নিজের দুঃখগুলো বলে সামান্য হালকা হওয়ার চেষ্টা করতেন।
.আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের শেষ জীবনের একটি পরম ইচ্ছা ছিল গ্রাম এলাকায় একটি সংগীতের স্কুল করে সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে সময় কাটাবেন। কিন্তু তা আর পূরণ হলো না। ২২ জানুয়ারি ২০১৯ ভোর রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। এর আগে প্রথম ২০১৮ সালের ১ মে তারিখে হার্টের সমস্যা নিয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে দুদিন থাকার পর ডাক্তারগণ বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দিলে সার্বিক প্রস্তুতির জন্য বাসায় চলে আসেন। কিছুদিন পরে নিজের অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। এতে তাঁর ভক্তগণ ভীষণভাবে চিন্তিত হয়েছিলেন এবং তার অসুস্থতা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা হতে থাকে; যা সরকারকেও বেশ ভাবিয়ে তোলে।
.এমন পরিস্থিতিতে সরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার সরকারিভাবে গ্রহণের ঘোষণা দেয়। প্রস্তাব দেওয়া হয় বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর। কিন্তু তিনি দেশের চিকিৎসা ছেড়ে বিদেশে যেতে রাজি হননি। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, আমার দেশের সাধারণ মানুষ বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন না। তারা সবাই দেশে চিকিৎসা করান। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশের হাসপাতালে দেশের ডাক্তারদের দ্বারাই চিকিৎসা করাবো।
.পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণের তত্ত্বাবধানে অপারেশন থিয়েটারে যাবার কিছুদিন আগে তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে দেশবাসী ও ভক্ত—অনুরাগীদের কাছে দোয়া চেয়ে লিখেছিলেন, অপারেশনের আগে দশ সেকেন্ডের জন্য আমার বুকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আর পবিত্র কুরআন শরীফ রাখতে চাই। হাসপাতালে অপারেশনের আগে তার এই ইচ্ছা পূরণে সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগী হিসেবে থাকা লেখক গাজী তানভীর আহমদ।
.সেই পতাকা আর পবিত্র কুরআন শরীফ তার পরিবারের কাছে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু নিখাদ দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীতজ্ঞ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এখন চিরশায়িত আছেন মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। এই মহান গুণী মানুষটি আর কখনো ফিরবেন না। দোয়া করছি, মহান আল্লাহ যেন পরাপারে তাঁকে ভালো রাখেন, শান্তিতে রাখেন।

গাজী তানভীর আহমদ লেখক ও সম্পাদক
পুরানা পল্টন, ঢাকা— ১০০০