
নিজস্ব প্রতিবেদক | ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নয়টি উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চলছে তীব্র ঔষুধ সংকট। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা খালি হাতে ফিরছেন প্রতিদিনই। এ নিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের বাকবিতণ্ডা ও হতাশার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিতভাবে।
সেবা নিতে আসা সখিনা বেগম বলেন,“আমি গরীব মানুষ, আমার মেয়ের বাচ্চা হবে, তাই এখানে আইছি। ডাক্তার বেডী আমারে এই স্লিপ ধরাইয়া দিছে। আগে বেশিরভাগ ঔষুধ এখানেই দিতো, এখন ৭০০ টাকা দিয়ে দোকান থেকে কিনতে হইছে।”
একইভাবে আকলিমা নামের এক নারী জানান,“আগে এখান থেকে চুলকানি, গ্যাস্টিক, কাশি, ভিটামিন আর আয়রনের ঔষুধ নিতাম। এখন কিছুই দেয় না, বলে ঔষুধ নাই।”
পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের অভিযোগ, আগে যেখানে অফিস থেকে ৬০ প্রকার ঔষুধ সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে মাত্র ১০–১২ ধরনের কিছু সীমিত ঔষুধ পাঠানো হচ্ছে— তাও খুব অল্প পরিমাণে।
একজন পরিদর্শিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত নিয়মিত ৬০ ধরনের ঔষুধ পেতাম। এখন ১০-১২ ধরনের সামান্য কিছু দেওয়া হয়। এতে রোগীরা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে, আমরা নিজেরাও বিব্রত।”
জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে নবজাতকরা বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত টিকা পাচ্ছে না, যা ভবিষ্যতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১.৫ থেকে ২ মাস বয়সী শিশুদের জন্য পাঁচ ধরনের টিকা — বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, পোলিও, পিসিভি ও রোটা — নির্ধারিত। কিন্তু বর্তমানে কোথাও দুটি, কোথাও মাত্র একটি টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
একজন টিকা প্রদানকারী জানান,“চাহিদা অনুযায়ী টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি মাসে যত টিকা দরকার, তার অর্ধেকেরও কম আসছে। এতে অভিভাবকরা হতাশ, আমরাও অসহায়।”অন্য একজন যোগ করেন,অনেক সময় বাবা-মায়েরা দূরদূরান্ত থেকে বাচ্চা নিয়ে আসে, কিন্তু টিকা না থাকায় ফিরতে হয়। এতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।”
অভিভাবক সেলিনা বেগম বলেন,“আমার দুই মাসের ছেলেকে নিয়মমাফিক পাঁচটি টিকা দেওয়ার কথা, কিন্তু আজ শুধু একটাই দিতে পারল। আমরা চিন্তায় আছি, এটা বাচ্চার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ!”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান,“জাতীয় পর্যায়ে টিকার সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আশা করছি দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা পাওয়া যাবে এবং নিয়মিত কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে।”
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন,“জাতীয় পর্যায়ে টিকা ও ঔষুধ সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।”
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ফার্মেসির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।স্বাস্থ্যকর্মী ও অভিভাবকরা দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা ও টিকা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
