ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এক সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ১৯৭৭ সালের পর সর্বোচ্চ। শুক্রবার প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মধ্যে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। তবে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে না বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনে দীর্ঘ রাজনৈতিক দরকষাকষি হতে পারে।
নির্বাচন চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ করেছে বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল। তবে ইসরায়েলের সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি (সিইসি) জানিয়েছে, ব্যালট জালিয়াতির মতো কোনো পদ্ধতিগত কারচুপির প্রমাণ মেলেনি। ইসরায়েলের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার কারণে সেখানে সর্বদা জোট সরকার গঠিত হয়ে এসেছে। এবার নির্বাচনে দুই প্রধান শিবিরের বাইরেও অন্যান্য ছোট দলগুলোর সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গঠিত ‘পরিবর্তন ব্লকের’ মূল মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন নতুন গঠিত ‘ইাশার পার্টি’র নেতা গাদি আইজেনকোট। এই জোটে রয়েছে নানা মতাদর্শের রাজনৈতিক দল, যাদের প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা। আইজেনকোট ছাড়াও এই ব্লকে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, অবিগদোর লিবারম্যান এবং বামপন্থী সাবেক জেনারেল ইয়াইর গোলান। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে দেশের চরম ডানপন্থী ও আল্ট্রা-অর্থোডক্স ধর্মীয় দলগুলোর ওপর নির্ভর করছেন, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থী জোট হিসেবে বিবেচিত।
নির্বাচনে নিরাপত্তার বিষয়টি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিরোধী দলগুলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে সরাসরি দায়ী করেছে। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। বিরোধীরা এই হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করলেও নেতানিয়াহু তা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচার বিভাগীয় বিতর্কিত সংস্কার উদ্যোগ নিয়েও তীব্র সমালোচনা চলছে। তবুও নেতানিয়াহু নিজেকে ‘মিষ্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে উপস্থাপন করে ভোটারদের সমর্থন টানার চেষ্টা করেছেন।
নির্বাচনের ঠিক আগের দিনগুলোতে নেতানিয়াহু একটি এআই-জেনারেটেড পারমাণবিক বোমার ছবি প্রকাশ করে ভোটারদের সতর্ক করেন যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করলে কেবল তিনিই ইসরায়েলকে রক্ষা করতে পারবেন। তবে এই বক্তব্যকে ‘হিস্টিরিয়া’ বলে অভিহিত করেছেন আইজেনকোট। এছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন হামলা চালানোর অনুরোধ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সত্যতা নেতানিয়াহু অস্বীকার করেছেন।
অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও নেতানিয়াহু সরকার পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। গাজা যুদ্ধের বিষয়ে আইজেনকোটের অবস্থানও কিছুটা নেতানিয়াহুর মতোই। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আদালতের তোয়াক্কা না করে ইসরায়েল লাগাতার হামলায় গাজায় এখন পর্যন্ত ৭৪,০০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করেছে বলে সেখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দেশটির সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠী সমর্থিত দলগুলোও, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তাত্ত্বিক বিচারে তারা সরকার গঠনে ‘কিংমেকার’ হতে পারত, তবে প্রধান ইহুদি দলগুলো তাদের সঙ্গে জোট বাঁধার বিষয়টি আগেই বাতিল করে দিয়েছে। ভোটের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে যদি কোনো জোটই সরকার গঠনে সক্ষম না হয়, তবে দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অচলবস্থা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আবার নতুন নির্বাচনের ডাক আসতে পারে এবং নেতানিয়াহু মধ্যবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদে বহাল থেকে যাবেন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।