বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: হতে পারে একটি সমন্বিত উদ্যোগ

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব সরকারি অফিস-আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
WhatsApp Image 2026-09-14 at 04.50.04
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

আহমেদ আবু জাফর: দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম, লোডশেডিং ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা জনজীবন ও অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করছে, তা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের অন্যতম পথ। আমাদের দেশে বছরের বড় একটি সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। অথচ সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে স্টেশনসহ অসংখ্য স্থাপনার ছাদ ও খোলা জায়গা এখনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়নি।সরকার চাইলে একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব সরকারি অফিস-আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন সোলার প্যানেল স্থাপন করাই নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, গ্রিড-সংযুক্ত (on-grid) সৌরবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এর ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই সাশ্রয়ী অর্থ আবার নতুন বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।

শুধু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ জনগণকেও এই কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার করতে হবে। সরকার চাইলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সহজ শর্তে, প্রয়োজনে সুদমুক্ত বা অত্যন্ত স্বল্পসুদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। সেই অর্থ দিয়ে বাড়ির ছাদ, টিনের চাল বা উপযুক্ত স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে। সোলার সিস্টেম স্থাপনের ব্যয় পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকি এবং তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের জন্য ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, ‘সবার জন্য সৌরবিদ্যুৎ’ এমন একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ জনগণের নিজেদের বাড়িতেই বিকেন্দ্রীভূতভাবে উৎপাদিত হবে।

দেশের রেলওয়ে এবং লঞ্চ স্টেশনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের ৩০০-এর বেশি রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এবং লঞ্চ টার্মিনালের ওপর থাকা শেডগুলোতে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। রেলওয়ে এবং লঞ্চ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ চাইলে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি স্টেশনের ছাদ ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থাপনা পরিদর্শন করে কতটুকু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তার একটি হিসাব তৈরি করতে পারে। শুধু স্টেশন নয়, রেলওয়ের বিভিন্ন ভবন, কার্যালয়, ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য স্থাপনাও এই কর্মসূচির আওতায় আনা যেতে পারে। এতে রেলওয়ের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও চাপ কমবে।

এছাড়াও দেশের হাজার হাজার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।একটি বিদ্যালয় হয়তো অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু দেশের হাজার হাজার বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তার সম্মিলিত পরিমাণ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য হতে পারে।এর পাশাপাশি এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ক্ষেত্রও তৈরি করবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে ধারণা লাভ করতে পারবে। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

দেশের অসংখ্য মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবনেও সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বড় মসজিদ, মডেল মসজিদ ও অন্যান্য বড় ধর্মীয় স্থাপনার ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ চাহিদা অনুযায়ী ছোট ও মাঝারি আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে। এখানেও সংশ্লিষ্ট মসজিদ বা মন্দির কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই প্রকল্পের অর্থায়ন, মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব স্বচ্ছ রাখতে হবে। শুধু সোলার প্যানেল বসালেই হবে না, তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না।

এটি হতে পারে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উৎস। কারণ সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। সন্ধ্যা ও রাতে এর উৎপাদন কমে যায়। তাই সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। এ ছাড়া নিম্নমানের সোলার প্যানেল বা অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই সরকারকে মান নির্ধারণ, অনুমোদিত সরবরাহকারী নির্বাচন, ইনস্টলেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজন জাতীয় ‘রুফটপ সোলার মিশন’এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকল্প নয়; বরং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি। সরকার চাইলে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার মিশন’ বা এ ধরনের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এর আওতায়—সরকারি অফিস-আদালত; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা; রেলওয়ে স্টেশন; লঞ্চ টার্মিনাল, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়; মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র; আবাসিক ভবন এবং সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদ ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে।

প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য ছাদ ও স্থাপনার একটি ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। কোথায় কত কিলোওয়াট বা মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, কত ব্যয় হবে এবং কত বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে তারও একটি বাস্তবসম্মত হিসাব করা প্রয়োজন।উদ্যোগের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এ ধরনের একটি বিশাল কর্মসূচি কেবল সরকারের পক্ষে একা বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাই স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির কমিটি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার অর্থায়নের পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে পারে। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি সহজ কিস্তির ঋণ দিতে পারে। বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারে। আর জনগণ হতে পারে এই বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদার।

সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিদ্যুৎ সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি জড়িত।

তাই সংকট দেখা দিলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে।বাংলাদেশের প্রতিটি উপযুক্ত ছাদ যদি একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হয়, প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশনের শেড যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, প্রতিটি বড় স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের বিদ্যুতের একটি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করে তাহলে সম্মিলিতভাবে এর প্রভাব ছোট হবে না।

প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং কঠোর বাস্তবায়ন। আজ যে ছাদগুলো খালি পড়ে আছে, আগামী দিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সেই ছাদগুলোই হতে পারে আমাদের অন্যতম বড় সম্পদ। বিষয়টি নিয়ে সরকার বাহাদুর গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে পারেন।

লেখক : আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ