ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডায় এক ব্রিটিশ নাগরিকের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রায় ১০ মাস পার হলেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিলম্বের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে রয়েছে। ৪৭ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু ফ্রেডেরিকের সংগৃহীত মৃতদেহ ও তছনছ হওয়া ঘর উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা ‘হোমিসাইড’ বলে উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় পুলিশ মামলাটি বন্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে নিহতের পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি গ্রেনাডায় ফ্রেডেরিকের লাশ পাওয়া যায়। মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা প্রাথমিক ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রেডেরিককে গুরুতর আঘাত ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল, যার মধ্যে তার পায়ের নখ উপড়ে ফেলার আলামতও রয়েছে। রোগতত্ত্ববিদ সরাসরি এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন। তা সত্ত্বেও গ্রেনাডা পুলিশ দাবি করে যে সেখানে কোনো হত্যাকাণ্ডের ভিত্তি নেই এবং তারা তদন্ত বন্ধের ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা ‘মার্ডারড অ্যাব্রোড’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইভ হেন্ডারসন ফোরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও)-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পররাষ্ট্রবিষয়ক সিলেক্ট কমিটিকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। হেন্ডারসন বলেন, প্রতিবছর বিদেশে অবস্থানকালে খুন হওয়া ৬০ থেকে ৮০টি ব্রিটিশ পরিবারের সঠিক বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক বিলম্ব চরম হতাশার সৃষ্টি করছে।
পরিবারের দীর্ঘ আন্দোলনের পর চলতি বছরের আগস্টে ফ্রেডেরিকের মরদেহ যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক তথ্য সামনে আসে। ব্রিটিশ চিকিৎসকেরা দেখেন যে ফ্রেডেরিকের মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুসসহ সব অভ্যন্তরীণ অঙ্গ এবং ঘাড়ের কিছু অংশ উধাও হয়ে গেছে। গ্রেনাডা কর্তৃপক্ষ ছয় সপ্তাহ মৃতদেহ নিজেদের হেফাজতে রাখলেও এসব অঙ্গ কোথায় গেল বা কেন সরানো হলো সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
নিহতের পরিবার এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে জানায়, স্বজন হারানোর কষ্টের ওপর এই আবিষ্কার তাদের নতুন করে মানসিক আঘাত দিয়েছে। বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা সত্ত্বেও গ্রেনাডা সরকারের পক্ষ থেকে অর্গান বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে যাওয়ার কোনো উত্তর মেলেনি। পরিবারটি অভিযোগ করেছে, একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তরের জন্য তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাবেক এক নির্দেশক ও হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড জনস্টন গ্রেনাডা পুলিশের ভূমিকাকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, একজন যোগ্য মেডিকেল এক্সামিনার স্পষ্টত এটিকে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের সুবিধাজনক তত্ত্ব দাঁড় করাতে গিয়ে সত্যকে উপেক্ষা করেছে। অপরাধ সংঘটনের প্রথম ২৪ ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’-এ আলামত সংগ্রহের যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল, গ্রেনাডা পুলিশ তা অবহেলা করে নষ্ট করেছে।
গত মাসে যুক্তরাজ্যের একজন কর্নার মেট্রোপলিটন পুলিশকে ফ্রেডেরিকের মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার গ্রেনাডা সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন এবং একটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রস্তাব জানান। গ্রেনাডা কর্তৃপক্ষ সহযোগিতার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও যুক্তরাজ্য থেকে পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ফাইলটি এখনও স্বাক্ষর না করে আটকে রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর (এফসিডিও)-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা গ্রেনাডায় নিহত ব্রিটিশ নাগরিকের পরিবারের পাশে রয়েছেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। অন্যদিকে গ্রেনাডা পুলিশের সাথে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। নিহতের পরিবার এখন গ্রেনাডার প্রধানমন্ত্রী, যিনি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীর দায়িত্বেও আছেন, তার কাছে মানবিক আবেদন জানিয়েছেন যাতে চুক্তিটিতে দ্রুত স্বাক্ষর করে যুক্তরাজ্যের পুলিশকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।