যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নতুন নীতি ও বিধিনিষেধের পর গত এক বছরে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি বা ‘সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ (স্ন্যাপ)-এর আওতা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাদ পড়েছেন। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই কর্মসূচির গ্রহীতা ছিলেন ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষ, যা ২০২৬ সালের জুনে কমে ৩ কোটি ৬৫ লাখে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফুড স্ট্যাম্প সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ কমেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই পরিবর্তন মানুষকে কাজ অনুসন্ধানে উৎসাহিত করবে। তবে স্থানীয় প্রতিনিধি, অলাভজনক সংস্থার কর্মকর্তা এবং খাদ্য সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের মতে, নিয়ম কঠোর করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের এই পরিবর্তনের ফলে আগামী ১০ বছরে স্ন্যাপ খাতে প্রায় ১৮৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় কমবে বলে ধারণা করছে কমার্শিয়াল বাজেট অফিস।
নতুন নিয়মের অধীনে ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ব্যক্তিরা, যাদের ঘরে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো নির্ভরশীল সদস্য নেই, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ২০ ঘণ্টা বেতনভুক্ত কাজ বা স্বেচ্ছাসেবী কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পূর্বে ১৮ থেকে ৫৪ বছর বয়সী ব্যক্তি যাদের ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তান নেই, তাদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। এছাড়া ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রশাসনিক খরচের ৭৫ শতাংশ এখন রাজ্যগুলোকে বহন করতে বলা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের প্রভাব একেক রাজ্যে একেক রকম দেখা গেছে। অ্যারিজোনায় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে স্ন্যাপ গ্রাহকের সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কেন্টাকিতে এই হার কমেছে ৬ শতাংশ। কেন্টাকির ডেমোক্র্যাট গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার মার্কিন কৃষিসচিব ব্রুক রলিন্সকে দেওয়া এক চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, স্ন্যাপ-এর পরিবর্তনের ফলে শিশু ও বয়স্কসহ তার রাজ্যের বহু মানুষ খাদ্য কষ্টে পড়ছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প ও কৃষিসচিব ব্রুক রলিন্স এই হ্রাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। রলিন্স আগস্টে একটি অনুষ্ঠানে বলেন, যারা কাজকে উদযাপন করে এবং চায় মানুষ ফুড স্ট্যাম্পের ওপর নির্ভর না করে কাজ করুক, তাদের জন্য প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে এই তালিকা থেকে বের করা বড় এক সাফল্য। তবে ভূক্তভোগী ও সমালোচকদের দাবি, নিত্যপণ্যের দাম এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সময়ে কাজের পর্যাপ্ত সুযোগ ছাড়া এই সহায়তা বন্ধ করা অন্যায্য।
খাদ্য ব্যাংকগুলোতে এখন সহায়তার জন্য মানুষের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মিশিগানের ফুড ব্যাংক কাউন্সিলে হটলাইনে সহায়তার আবেদন আগের চেয়ে তিন গুণ বেড়েছে, যার কারণে সাময়িকভাবে লাইন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ফিড লুইভিল নামক অলাভজনক সংস্থার প্রধান রোনা কামার জানিয়েছেন, রেস্তোরাঁ ও কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত খাদ্য এনে যারা বিতরণ করতেন, এখন দিনের শেষে তাদের তাকগুলো পুরোপুরি খালি হয়ে যাচ্ছে।
স্ন্যাপ গ্রহীতার সংখ্যা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়গুলোতেও। যেসব স্কুলে অন্তত ২৫ শতাংশ শিশু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তারা ‘কমিউনিটি এলিজিবিলিটি প্রোভিশন’ (সিইপি) প্রোগ্রামের আওতায় সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে প্রাতরাশ ও দুপুরের খাবার দিতে পারে। কিন্তু স্ন্যাপ গ্রহীতা কমে যাওয়ায় হিউস্টন স্বাধীন স্কুল ডিস্ট্রিক্টের ২৬টি স্কুল আর এই সুবিধা দিতে পারছে না বলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইউএসডিএ-এর একজন মুখপাত্র অবশ্য নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাবকে সরাসরি স্বীকার না করে জানিয়েছেন যে, গ্রাহকের সংখ্যা পরিবর্তনশীল এবং তা নির্দিষ্ট কোনো নীতি দ্বারা একমাত্রিক উপায়ে নির্ধারিত হয় না। তবে আগামীতে রাজ্যগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং পেমেন্ট ভুলের হার বেশি হলে তাদের সরাসরি জরিমানা ও অতিরিক্ত খরচ দিতে হতে পারে, যা সহায়তার আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটাবে বলে আশঙ্কা গবেষকদের।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।