মো মনির হোসাইন: আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে সচলতা এবং আধুনিকতার ছোঁয়া আমরা দেখতে পাই, তার মূল ভিত্তি রচিত হয় এমন কিছু মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনিতে, যারা পর্দার আড়ালে থেকে যান চিরকাল।
ছবিতে ফুটিয়ে তোলা কাদা-মাখা পথে ভারী বোঝাসহ ঠেলাগাড়ি টেনে নিয়ে চলা মানুষটির অবয়ব কেবল একটি মুহূর্তের স্থিরচিত্র নয়; এটি আমাদের সমাজের এক নির্মম ও গভীর বাস্তবতার জীবন্ত দলিল।
সকালের প্রথম আলো ফোটার আগেই কিংবা শীতের কুয়াশা ভেদ করে এই মানুষগুলো যখন জীবিকার সন্ধানে পথে নামে, তখন তাদের পিঠে কেবল বস্তার বোঝা থাকে না, থাকে পুরো একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি ও দায়িত্বের পাহাড়।
শহরের পিচঢালা পথ কিংবা গ্রামের মেঠোপথ—সব জায়গাতেই এই মেহনতি মানুষগুলোর ঘাম ঝরে নিঃশব্দে। তীব্র রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারে না। তাদের জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক অবিরত যুদ্ধ।
একটু ভালো থাকার আশায়, সন্তানের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেওয়ার প্রত্যাশায় তারা নিজেদের সমস্ত শারীরিক কষ্টকে বিসর্জন দেন। খালি পায়ে পিচ্ছিল রাস্তায় ভারী গাড়ি টানতে গিয়ে তাদের পেশিগুলো যেভাবে সংকুচিত হয়, তা তাদের অন্তहीन আত্মত্যাগেরই সাক্ষ্য দেয়।
অথচ সমাজের একটি বড় অংশ এই মানুষগুলোর অবদানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে। তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন তো দূরের কথা, অনেক সময় তাদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান বা মানবিক আচরণটুকুও করা হয় না।
এই নীরব অবহেলা কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল নয়, এটি আমাদের মানসিক সংকীর্ণতারও পরিচায়ক। আমরা আধুনিকতার উচ্চ শিখরে পৌঁছানোর অহংকার করি, অথচ যার পরিশ্রমে এই শহর বা বাজার সচল থাকে, তার গায়ে লেগে থাকা কাদা আর ঘামের গন্ধ আমাদের বিচলিত করে না।
এই অদৃশ্য যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিকতার জাগরণ প্রয়োজন। তাদের নায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং সমাজে তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
যতক্ষণ না এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর মুখে প্রকৃত হাসি ফুটবে এবং তাদের জীবন থেকে অবহেলার অন্ধকার দূর হবে, ততক্ষণ আমাদের সমস্ত উন্নয়ন ও অগ্রগতির দাবি অর্থহীন ও অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।