যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের পিটার থিলের জন্য ঐতিহাসিক বায়ো ট্যাপেস্ট্রির একটি গোপন বা ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন জানিয়েছেন, তিনি ভেবেছিলেন এই সফরের কথা কেউ জানতে পারবে না। সামারসেটের ‘বিগ ব্রু’ ফেস্টিভ্যালে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
জর্জ অসবর্ন জানান, যখন মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পিটার থিলকে মধ্যযুগীয় এই শিল্পকর্মটি দেখানো হচ্ছিল, তখন তিনি নিজে ছুটিতে ছিলেন। পেপ্যালের প্রতিষ্ঠাতা থিল একই সাথে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। প্যালান্টিয়ার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা সরকারি সংস্থা ও বড় কর্পোরেশনের জন্য ডাটা ইন্টিগ্রেশন, অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। মার্কিন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত থিলের এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ বিতর্কিত।
প্রদর্শনী সম্পর্কে অসবর্ন বলেন, তারা মোটেও আশা করেননি যে এই সফরের বিষয়টি সাধারণ মানুষের জানাজানিতে পরিণত হবে। তবে গত ১৮ আগস্ট সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর খোলার আগেই একটি বিশেষ ভিআইপি প্রদর্শনীর মাধ্যমে থিলকে ট্যাপেস্ট্রিটি ঘুরিয়ে দেখান মিউজিয়ামের ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর শার্লট অ্যাপলইয়ার্ড। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা এই সফরের খবরটি দ্রুত জনসম্মুখে নিয়ে আসে।
পিটার থিলকে এই সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে জাদুঘর কী পেয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে অসবর্ন বলেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে তিনি কোনো অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেননি। তবে তিনি যদি কোনো অর্থ দিতেন, তবে মিউজিয়ামের পরিচালনা পর্ষদ তা বিবেচনা করত। আয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সুনামগত ঝুঁকির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশের পর মিউজিয়ামের সামনে বিক্ষোভ গড়ে ওঠে। অসবর্ন অভিযোগ করেন, ইসরায়েল সরকারকে সমর্থন করে এমন কোনো দাতা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মানুষ ব্রিটিশ মিউজিয়ামকে ‘ফরেন অফিস’ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো মনে করে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে যখন তিনি এই দায়িত্ব নেন, তখন জলবায়ু আন্দোলনকারীরা মূলত বিক্ষোভ করত। কিন্তু এখন প্রায় সব প্রতিবাদই গাজা কেন্দ্রিক।
অসবর্ন আরও যোগ করেন, এটি বর্তমানে জাদুঘরের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কঠিন রাজনৈতিক বিষয়। তারা এটি সামলানোর চেষ্টা করছেন। তবে সবাইকে মনে রাখা দরকার যে ব্রিটিশ মিউজিয়াম কোনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়।
জাদুঘর পরিচালনার স্বার্থে বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন অসবর্ন। তিনি জানান, বিপি (BP)-র মতো জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাদের অর্থ নিতে হয়। অসবর্ন প্রশ্ন তোলেন, মানুষ একদিকে মিউজিয়ামে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ চায়, আবার তেল বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থ গ্রহণে আপত্তি জানায়। যদি বিপি-র মতো প্রতিষ্ঠান ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ দিতে চায় এবং তারা তা তেল উত্তোলনের অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়, তবে জাদুঘর চালানোর অর্থ কোথায় পাওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ না নিলে বিনামূল্যে চালিত এই জাদুঘরটি বন্ধ করে দিতে হবে।
উল্লেখ্য, পিটার থিলের প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিয়ার ব্রিটিশ পাবলিক সেক্টরে অনেকগুলো চুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হলো ২০২৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস (NHS)-এর সাথে তাদের ৩৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি। এ ছাড়া কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাথেও কাজ করে। গাজা ও ইরানে সামরিক হামলায় প্যালান্টিয়ারের এআই সফটওয়্যারের ব্যবহার, মার্কিন অভিবাসন অভিযানে সহায়তা এবং এনএইচএসের তথ্যে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্যালান্টিয়ারকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।