
**ICJ-এর জলবায়ু বিবৃতি: বাংলাদেশ ও পৃথিবীর জন্য একটি নতুন আশার সকাল!**
পৃথিবী জুড়ে একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিস্মিত করেছে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিচারাধিকরণ (International Court of Justice – ICJ) নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত শান্তি প্রাসাদে (Peace Palace) একটি ঐতিহাসিক জলবায়ু বিবৃতি ঘোষণা করেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্ব নির্ধারণ করে। এই ১৩৩ পৃষ্ঠার দলিলটি ICJ-এর প্রেসিডেন্ট জাজ ইয়ুজি ইওয়াসাওয়া (Yuji Iwasawa) পড়ে শোনান, যা ১৫ জজের সম্মিলিত একমত রায়ে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই বিবৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের দেশটি জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, এবং তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। এই রায়টি আমাদের কৃষক, মৎস্যজীবী, এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি আশার রশি হয়ে উঠেছে, যারা প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি, ফসল, এবং জীবন হারাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে ICJ “অত্যন্ত জরুরি এবং অস্তিত্বের হুমকি” (urgent and existential threat) হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এবং মানুষের কারণে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস (GHG) নির্গমনকে রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্বের আওতায় আনে। বিশ্বব্যাপী কার্বন দূষণের বিরুদ্ধে এই রায় একটি বড় ধাক্কা, যেখানে ফসিল ফুয়েল (আগ্নেয়গিরি জ্বালানি) উৎপাদন, ভোগ এবং সহায়তা—যেমন নতুন তেল-গ্যাস লাইসেন্স বা সাবসিডি—কে আন্তর্জাতিকভাবে ভুল কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে, যেখানে পদ্মা, মেঘনা, ও জামুনা নদীর তীরে প্রতি বছর জলোচ্ছ্বাসে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষ তাপপ্রবাহে জ্বালাপোড়া হয়ে যাচ্ছে, এই রায়টি আমাদের জন্য একটি জয়ের সংকেত। ২০২৩ সালের মহাপ্রলয়ে ৭ মিলিয়ন মানুষ প্রভাবিত হয়েছিল, এবং গত বছর কক্সবাজারের সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়েছে—এই রায় ধনী দেশগুলোকে আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারে।
ICJ-এর রায়ে জলবায়ু ক্ষতির জন্য প্রতিকারের (reparations) সম্ভাবনা খোলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অপূর্ব সুযোগ। যে রাষ্ট্রগুলো এই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে, তারা আইনগতভাবে দায়ী হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশ প্রতিকার দাবি করতে পারবে। এই প্রতিকারে পুনর্গঠন (restoration of ecosystems), অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ—যেমন বাঁধ বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি—এবং অর্থপ্রদান জুড়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশে, যেখানে কচ্ছপির নদীতে মাছ ধরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে, এই রায় আমাদের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে। ICJ-এর মতে, পরিষ্কার, সুস্থ এবং স্থিতিশীল পরিবেশ একটি মানবাধিকার (human right), যা UN মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights, 1948, Article 25) এবং UNFCCC (1992) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(অ) ধারা (Article 18A) এর অধীনে পরিবেশ রক্ষার নির্দেশ রয়েছে, এবং সুপ্রিম কোর্টের মহিউদ্দিন ফারুকি বনাম বাংলাদেশ (1997) মামলায় ‘জীবনের অধিকার’ ও ‘পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন’ এর মাধ্যমে পরিবেশীয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য আইনি শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে আমরা জলবায়ু ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব।
এই বিবৃতির উৎস একটি অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প—২০১৯ সালে ফিজির ছাত্রদের দল প্যাসিফিক আইল্যান্ড স্টুডেন্টস ফাইটিং ক্লাইমেট চেঞ্জ (PISFCC) গড়ে তুলে এই আন্দোলন শুরু করে। ভানুয়াটু সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ICJ-এ বিষয়টি তুলে ধরে, যাতে ১৩০টিরও বেশি রাষ্ট্র অংশ নেয়—বাংলাদেশও এর মধ্যে ছিল। বাংলাদেশের তরুণরা, যারা বরিশালের নদীতীরে বা ঢাকার শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখেছে, এই সংগ্রামে নিজেদের স্বর যোগ করেছে। ছাত্র সিওসিউয়া ভেইকুন বলেছেন, “এটি আমাদের জয়, এবং বাংলাদেশের কৃষকদের জন্যও জয়।” বাংলাদেশ জাতীয় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নীতি (2018, ৪.২ ধারা) এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন (2010, Section 15) এর মাধ্যমে দেশ জলবায়ু অর্থ তৈরি করছে, যা এই রায়ের সাথে মিলে আমাদের জন্য শক্তি যোগাবে।
এই সিদ্ধান্তের আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয় (non-binding), এর নৈতিক ও আইনি ভার বড়। এটি ভবিষ্যতের জলবায়ু মামলা ও আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্য হাতিয়ার হবে। COP30 (নভেম্বর ২০২৫, ব্রাজিল) এ বাংলাদেশের কণ্ঠ শক্তিশালী হবে, যেখানে আমরা ধনী দেশদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারব। যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি (2015, Article 2) যথেষ্ট মনে করলেও, ICJ সব রাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। বাংলাদেশে পরিবেশ আদালত আইন (2010, Section 4) এর আওতায় এই রায় ব্যবহার করে আমরা জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালাতে পারি।
সংযুক্ত রাষ্ট্রের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেশ বলেছেন, “এটি গ্রহ ও তরুণদের জয়।” বাংলাদেশের জন্য এটি আমাদের নদী, মাটি, এবং সন্তানদের ভবিষ্যত রক্ষার সুযোগ। তবে বড় দেশগুলোর গ্রহণযোগ্যতা চ্যালেঞ্জ হবে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি স্বপ্নের শুরু—আমাদের কৃষকদের জন্য ফসলের সুরক্ষা, মৎস্যজীবীদের জন্য নিরাপদ জীবন, এবং তরুণদের জন্য একটি সবুজ ভবিষ্যত। এটি শুধু রায় নয়, আমাদের জীবনের জন্য একটি লড়াই!
