— বিজ্ঞাপন —

বাবাহীন বাড়ি: যে শূন্যতার কোনো বয়স হয় না

তখন মনে হয়েছিল, আবার আসব। মানুষ এই ‘আবার’ শব্দটির ওপর কত নিশ্চিন্তে জীবন রেখে দেয়! তারপর একদিন ফিরে এসে দেখে, তার জন্য পথ আছে, বাড়ি আছে, উঠোন আছে; যার কাছে ফেরার কথা ছিল, তিনি নেই।
48153
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

অনেক দিন পর বাড়িতে এসে মনে হলো, আমি পৌঁছানোর আগেই এখানে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আকাশে তখনো বিকেলের রক্তিম আলো। পাতায় পাতায় বাতাসের মর্মর ধ্বনি। সবকিছুই চেনা। অথচ উঠোনে পা রাখতেই বুকের ভেতর এমন একটি দরজা খুলে গেল, যার ওপারে কেউ নেই।

বাবা থাকলে এই সময়ে কোথায় থাকতেন?

হয়তো ঘরের পাশে। হয়তো কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ডালের দিকে তাকিয়ে। আমার পায়ের শব্দ শুনে মুখ ফেরাতেন। সেই মুখ ফেরানোর ভেতরেই আমার বাড়ি ফেরা সম্পূর্ণ হতো। এখন পথ শেষ হয়েছে, উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছি, অথচ পৌঁছানো আর শেষ হচ্ছে না।

— বিজ্ঞাপন —

বাড়ির সামনে এসে আমার পা থেমে গেল।

এই পথ দিয়ে কতবার ফিরেছি। কখনো ক্লান্ত হয়ে, কখনো অভিমান নিয়ে, কখনো এমন কোনো আনন্দ বুকে করে, যা বাবাকে বলার আগে সম্পূর্ণ আনন্দ হয়ে উঠত না। বাড়ির কাছে এলে চোখ আপনিই তাঁকে খুঁজত। কোথায় বসে আছেন, কী করছেন, আমাকে দেখেছেন কি না।

আজও চোখ খুঁজল। মৃত্যুর খবর মন জানে; চোখ এখনো শেখেনি।

চারপাশে ঝোপঝাড় বেড়েছে। ঘরের গা ঘেঁষে লতা উঠেছে। উঠোনের কোথাও কোথাও ঘাস এত ঘন যে, মনে হয় দীর্ঘদিন কেউ এ পথে হাঁটেনি। অথচ বাড়িতে মানুষের যাতায়াত আছে, দরজা খোলে, আবার বন্ধ হয়। তবু বাবার যত্নে পরিচিত হয়ে ওঠা জায়গাগুলো আজ অচেনা লাগছে। একটি মানুষের হাত সরে গেলে কত দ্রুত সংসারের শরীরে অনাদরের দাগ পড়ে!

আতাগাছ, পেঁপে, পেয়ারা, কাঁঠালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পাতার ফাঁকে আলো ঢুকছে। তাদের দেখে মনে হলো, কারও দীর্ঘ অসুখের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়ের মতো তারা চুপ করে আছে। হয়তো এই বিষণ্নতা তাদের নয়; আমার বুকের ছায়াই তাদের গায়ে পড়েছে। আগে বাড়িতে এলে বাবা নিজের হাতে গাছ থেকে ফল এনে দিতেন। আজ ডালে ফল আছে, উঠোনে আমি আছি, মাঝখানের মানুষটি নেই।

সেই সামান্য দূরত্বটুকু আর কোনোদিন পার হওয়া যাবে না।

ঘরের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, বাড়ি পুরোনো হলে তার দেয়ালে ফাটল ধরে; বাবা চলে গেলে ফাটল ধরে ফিরে আসার আনন্দে।

দরজা পেরিয়ে মনে হলো, ভেতরে ঢোকার আগে কাউকে ডাকতে হবে। ঠোঁট সামান্য নড়ে উঠল। তারপর থেমে গেলাম। যে নামটি এতকাল অনায়াসে উচ্চারণ করেছি, আজ সেটি বলার আগে বুকের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হয়। যেন একটি শব্দ নয়, গভীর কুয়োর মুখে দাঁড়িয়ে পাথর ফেলব; তার পতনের শব্দ শুনতে শুনতে নিজের ভেতরের গভীরতা টের পাব।

বাবা।

মনে মনে ডাকতেই ঘর আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল।

এই ঘরে তাঁর থাকার কত চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। অথচ কোনো চিহ্ন থেকে মানুষটি উঠে আসেন না। স্মৃতি কখনো এত নির্মম হয়ে ওঠে যে, সে মুখ দেখায়, কণ্ঠ শোনায়, হাঁটার ভঙ্গি ফিরিয়ে আনে, তারপর হাত বাড়ানোর মুহূর্তে সব সরিয়ে নেয়। মনে হয়, দরজার আড়ালে বাবা আছেন। একটু পর বেরিয়ে আসবেন। আমি অপেক্ষা করি। কয়েক মুহূর্ত পর নিজের অপেক্ষার ওপরই দয়া হয়।

মানুষের বয়স বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, কণ্ঠে দৃঢ়তা আসে। অন্যের বিপদে সে সাহস দেয়, অন্যের শোকে সান্ত্বনার বাক্য খুঁজে পায়। অথচ বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মানুষটিই অসহায় হয়ে পড়ে। এত দিনের অর্জন তার কান্নার কোনো কাজে আসে না। সে শুধু চায়, কেউ আগের মতো তাকে সন্তান বলে জানুক; তার মুখ দেখে জিজ্ঞেস করুক, শরীর খারাপ কি না।

আমাকে এখন অনেকেই চেনে। আমার কথা শোনে। কিন্তু বাবা যেভাবে আমার চুপ করে থাকাটুকু চিনতেন, সেই পরিচয় কোথায় পাব?

বাবার কবরে গেলাম।

সবুজ ঘাসে ছেয়ে আছে। চারপাশে কয়েকটি ফুলগাছ। বাতাস এলে তারা দুলছে। বিকেলের আলো ঘাসের ডগায় এসে এমন কোমল হয়ে পড়েছে যে, এই জায়গার নিচে মৃত্যুর মতো কঠিন কিছু আছে, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

মাটির সামান্য উঁচু অংশটুকুর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

একজন মানুষের সমস্ত জীবন শেষে এতটুকু জায়গা। কত পথ হেঁটেছেন, কত দুশ্চিন্তায় রাত কাটিয়েছেন, কতদিন নিজের প্রয়োজন সরিয়ে সন্তানের প্রয়োজন সামনে রেখেছেন। সংসারের অভাব গোপন করতে কখনো হয়তো মুখে স্বাভাবিক ভাব ধরে রেখেছেন। আমরা তখন ছোট ছিলাম; তাঁর মুখের আড়ালের ক্লান্তি পড়তে পারিনি। এখন পড়তে শিখেছি, কিন্তু মুখটি আর দেখতে পাই না।

জীবন কখনো কখনো বোঝার ক্ষমতা দেয় এত দেরিতে যে, ক্ষমা চাওয়ার মানুষটিকে আর পাওয়া যায় না।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো, বাবার সঙ্গে আমার কথোপকথন শেষ হয়নি। অনেক কথা বলা বাকি। কিছু ধন্যবাদ, কিছু ক্ষমা, কিছু অকারণ অভিমান। এমন কত দিন ছিল, আরও একটু পাশে বসতে পারতাম। একটি কথা মন দিয়ে শুনতে পারতাম। তাড়াহুড়ো না করে তাঁর মুখের দিকে তাকাতে পারতাম।

তখন মনে হয়েছিল, আবার আসব।

মানুষ এই ‘আবার’ শব্দটির ওপর কত নিশ্চিন্তে জীবন রেখে দেয়! তারপর একদিন ফিরে এসে দেখে, তার জন্য পথ আছে, বাড়ি আছে, উঠোন আছে; যার কাছে ফেরার কথা ছিল, তিনি নেই।

বাবা, আমি এসেছি।

কথাটি খুব আস্তে বললাম। মনে হলো, জোরে বললে মাটির ওপরে রাখা আমার শেষ ধৈর্যটুকু ভেঙে যাবে।

কোনো উত্তর এলো না।

একটু দূরে একটি পাখি ডাকল। ঘাসের ভেতর ক্ষুদ্র কোনো প্রাণী নড়ে উঠল। বাতাস ফুলগাছের পাতায় হাত বুলিয়ে চলে গেল। এত শব্দের মধ্যে বাবার নীরবতা আলাদা করে শুনতে পেলাম। পৃথিবীর সমস্ত আওয়াজ মিলেও তাকে ঢাকতে পারছে না।

হঠাৎ তাঁর হাতের কথা মনে পড়ল।

আমি ছোটবেলায় যে হাত ধরে হাঁটতাম, সেই হাত একদিন শিথিল হয়ে গেছে। যে বুকে মাথা রাখলে পৃথিবীর ভয় কিছুটা কমে আসত, সেই বুকের ওপর এখন মাটি। আমার দুঃখ বাড়লে তিনি আর উঠে বসবেন না। আমি অসুস্থ হলে তাঁর রাত দীর্ঘ হবে না। আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় তিনি দরজার দিকে তাকাবেন না।

এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কান্না আসছিল, কিন্তু কান্নারও যেন বের হওয়ার পথ হারিয়ে গেছে। বুকের মধ্যে জমে থাকা জল পাঁজরের গায়ে আঘাত করছিল।

কবরের পাশে বসে ঘাস ছুঁয়ে দেখলাম।

শীতল।

বাবাকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাড়ানো হাতে ঘাসের শীতলতা ফিরে এলো। আঙুলের ডগা থেকে সেই অনুভূতি সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে গেল। মনে হলো, পৃথিবীর গভীরে একটি বন্ধ দরজা আছে; তার ওপারে বাবা, এপারে আমি। আমি যতই হাত রাখি, দরজাটি আমার উষ্ণতা গ্রহণ করে, খুলে যায় না।

কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম। মনে হলো, পুরোনো দিনের একটি বিকেল খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বাবা আছেন, আমি আছি, কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। তাঁর কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। চোখ খুললেই হয়তো তাঁকে দেখতে পাব।

চোখ খুলে ঘাস দেখলাম।

মানুষের শোকের মধ্যে এই ফিরে আসা কতবার ঘটে! স্মৃতি একটু আশ্রয় দেয়, বাস্তবতা এসে আবার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে।

বাবা, তোমার চলে যাওয়ার পরে আমি বুঝেছি, জীবনের অনেক লড়াই মানুষ জেতে শুধু এই ভরসায় যে, ক্লান্ত হয়ে ফিরলে তার জন্য একজন মানুষ থাকবে। সে হয়তো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তবু পাশে বসবে। বলবে, আগে একটু বিশ্রাম নে।

এখন ক্লান্তিও নিজের কাছে জমা রাখতে হয়।

দুঃখের কথা বলতে গিয়ে থেমে যাই। মনে হয়, তুমি শুনলে কষ্ট পেতে। পরক্ষণেই মনে পড়ে, তোমাকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও আমি হারিয়েছি। এই উপলব্ধির ভেতর এমন এক অসহায়তা আছে, যার কোনো সান্ত্বনাবাক্য হয় না।

সন্ধ্যা নেমে আসছিল। দূরের জমি থেকে কৃষকেরা ফিরছেন। কারও কাঁধে কাজের সরঞ্জাম, কারও পায়ে শুকনো মাটি। তাঁদের বাড়িতে হয়তো চুলা জ্বলবে, কেউ পানির কথা বলবে, কেউ দিনের খবর জানতে চাইবে। মানুষের জীবন এমন ছোট ছোট প্রত্যাশার ওপর টিকে থাকে।

আমি উঠতে পারছিলাম না।

তোমাকে এখানে রেখে কীভাবে ফিরে যাই, বাবা?

জানি, আমার থাকা তোমার কাছে পৌঁছায় না। চলে গেলেও তোমার ঘুম ভাঙবে না। তবু উঠে দাঁড়াতে মনে হচ্ছিল, আবার তোমাকে হারাচ্ছি। প্রথমবার মৃত্যু তোমাকে নিয়ে গেছে; আজ আমাকে নিজের পায়ে হেঁটে তোমার কাছ থেকে চলে যেতে হবে।

শেষবার ঘাসে হাত রাখলাম। কিছু বলার চেষ্টা করলাম। গলা দিয়ে শুধু একটি দীর্ঘ শ্বাস বের হলো।

তারপর বাড়ির দিকে ফিরলাম।

পেছনে তাকানোর পুরোনো অভ্যাসটি এখনো আছে। আগে তাকালে বাবা দাঁড়িয়ে থাকতেন। আজ পেছনে গাছের ছায়া, কয়েকটি ফুল, মাটির একটি উঁচু রেখা। তবু বারবার তাকালাম। যেন আমার দৃষ্টির ভুলে কোথাও তিনি বাদ পড়ে আছেন; আরেকবার দেখলে পাওয়া যাবে।

ঘরে ফিরে দেখি, অন্ধকার ঘরের কোণগুলো ভরে ফেলেছে। আমি দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর আলো জ্বালালাম।

ঘর স্পষ্ট হলো। বাবার অনুপস্থিতিও।

বাইরে পাতার মর্মর ধ্বনি। ভেতরে আমার শ্বাস। চারপাশে এমন এক নীরবতা, যেখানে নিজের বয়সের চেয়েও পুরোনো লাগে নিজেকে। মনে হয়, আজ আমি শুধু বাবাকে হারাইনি; তাঁর কাছে ফিরে যেতে পারা আমার ছোটবেলাটিকেও মাটির পাশে রেখে এসেছি।

তবু রাত হলে আমি বেঁচে থাকার কাজগুলো করব। পানি খাব। শুয়ে পড়ব। সকালে উঠব। মানুষ আমার কাছে কথা চাইবে, কাজ চাইবে, স্বাভাবিক মুখ চাইবে। আমিও যতটুকু পারি দেব।

কিন্তু কোনো এক অপ্রস্তুত মুহূর্তে, হয়তো কারও মুখে ‘বাবা’ শব্দটি শুনে, হয়তো সন্ধ্যার আলোয় একটি খালি জায়গা দেখে, বুকের ভেতর আবার সেই দরজা খুলে যাবে।

আমি আবার সন্তান হয়ে যাব।

আবার মনে হবে, এত কষ্ট হচ্ছে, বাবাকে বলি।

তারপর মনে পড়বে।

এই মনে পড়াটুকু পার হতে হতে আমার সমস্ত জীবন কেটে যাবে।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ০

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার ↗ PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ ↗ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী ↗ PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ ↗