
শুরুর আগে বলে রাখা ভালো, এই লেখার কোনো ছন্দ নেই, নেই কাঠামোর ঘেরাটোপ, নেই সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত অলঙ্কারবিধির আনুগত্য। আছে শুধু একরাশ ব্যথা, কিছু না-পাওয়া, আর বৃষ্টির দিনে ভিজে ওঠা এক জীবনের হিসাব। বাংলা সাহিত্যের উপমাগুলো আমি ধার করেছি, কারণ নিজের ভাষা আজ থেমে গেছে। তুমি যদি কখনো এই লেখা পড়ো, তাহলে জানবে—এটা লেখা হয়নি, ঝরে পড়েছে। ঠিক যেমন ঝরে পড়ে মেঘের কান্না—বৃষ্টির নামে।আজ সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। জানি, আবার বৃষ্টি হবে। কিন্তু এই বৃষ্টি আর আগের মতো আনন্দ নিয়ে আসে না। আগে ভাবতাম, বৃষ্টি মানেই প্রেম, একসাথে ভিজে যাওয়ার আবেগ, জানালার পাশে বসে গরম চায়ের কাপ, আর তোমার চোখে হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। এখন বৃষ্টি মানেই তুমি নেই।
তোমার না-থাকা এখন শুধু একটা অনুভব নয়, একটা বিশাল শূন্যতা। একটা সময় ছিল, যখন তোমার হাতে হাত রেখে বলতাম—“দেখো, বৃষ্টি শুরু হয়েছে।” তুমি হেসে বলতে, “প্রকৃতিও আমাদের ভালোবাসে।” আজ যখন বৃষ্টি নামে, আমি শুধু ভাবি—প্রকৃতিও কি আজ বেইমান হয়ে গেছে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “আকাশ ভাঙে বৃষ্টিতে, মন ভাঙে নীরবে।” আমার মন ভাঙার শব্দ হয়তো কারো কানে যায় না, কিন্তু আজ জানালার কাঁচে পড়া প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যেন সেই নীরব আর্তনাদের প্রতিধ্বনি।
আমি এখনো জানালার ধারে বসে থাকি, ঠিক যেমন তুমি রেখে গিয়েছিলে। চা খাই না, কথা বলি না, শুধু দেখি কীভাবে একটা দিনের আলো ম্লান হয়ে যায় মেঘের চাদরে, কীভাবে সেই মেঘ ঝরে পড়ে একাকার হয়ে মাটির সাথে। বৃষ্টি এসে সব ধুয়ে দেয়, শুধু তোমার স্মৃতি গুলো ধুয়ে দিতে পারে না।
তোমার চোখের জল আর এই বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে কী যে ভয়ানক সাদৃশ্য! একটা সময় ছিল, যখন তুমি কাঁদলে আমি কাঁদতাম। এখন শুধু বৃষ্টি কাঁদে, আর আমি চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, “যা চলে যায় তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না, শুধু তার স্মৃতি বয়ে বেড়ানো যায়।” আমি এখন সেই স্মৃতির ভার বয়ে চলেছি, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।তুমি চলে যাওয়ার পর, আমার ভিতরে একটা মরুভূমি জন্ম নিয়েছে। সেই মরুভূমির বুকে বৃষ্টি মানেই বিস্ময়। কিন্তু এই বৃষ্টি সে মরুতে প্রাণ ফোটায় না, শুধুই কাদায় রূপ নেয়। আমি হাঁটি সেই কাদায়, প্রতিটি পা ডুবে যায় ব্যথার নিচে। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ যেন আমার ভিতরে বাসা বেঁধেছে। আমিও তার মতো প্রতিদিন নিজের মৃত্যু সাজিয়ে নেই—বাঁচি না, আবার মরে যেতেও পারি না।
তুমি বলেছিলে, “যদি কখনো আমি না থাকি, তুমি কী করবে?” আমি হেসে বলেছিলাম, “তুমি থাকো না থাকো, আমি তো থাকবো আমাদের গল্পে।” আজ সেই গল্পটাই একতরফা। আজ শুধু আমি বলি, তুমি শোনো না। তুমি কোথায় আছো, জানি না। কিন্তু আমি জানি, আমার সমস্ত অনুভব এখন কেবল তোমাকে কেন্দ্র করে।
আহমদ ছফা লিখেছিলেন, “যে প্রেম গভীর, সে নীরব।” আমি আজ কথা বলি না, শুধু অনুভব করি। এই অনুভবের রঙ নেই, আকার নেই—শুধু আছে এক ধরনের ভার, যেটা বুকে চেপে বসে থাকে। কোনো ডাক্তার তার নাম দিতে পারে না, কোনো ওষুধ তাকে সারাতে পারে না। একেই বুঝি বলে—প্রেমের অসুখ।
বৃষ্টি যখন নামে, তখন আকাশের শব্দ হয়—গর্জন, ঝরঝর শব্দ, পাতা ছিঁড়ে পড়ার আর্তি। কিন্তু আমার ভিতরের বৃষ্টি একেবারে নিঃশব্দ। ঠিক যেমন জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সময় থেমে থাকে, আমি অনুভব করি—এই থেমে থাকা সময়ই আমার জন্য নির্ধারিত।
“ক্লান্তির ক্লান্ত শরীরে” আমি আজ একা। তুমি যদি জানতে, কী পরিমাণ অভিমান জমে আছে এই বৃষ্টিতে! তোমার চলে যাওয়ার পর প্রতিটি বর্ষার বিকেল হয়ে উঠেছে বিষণ্ণ এক স্মৃতি জাদুঘর। যেখানে প্রতিটি কোণে তোমার ছায়া—একটা ভেজা ওড়না, একটা চায়ের কাপ, আর জানালার পাশে বসে থাকা এক মায়াবী মুখ। তুমি চলে যাওয়ার আগে সেই মুখে বলেছিলে, “ভালো থেকো।” আমি বুঝিনি, সেই শব্দটা এত দীর্ঘ সময়ের বিদায় হয়ে থাকবে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য বলেছিল, “আমার ভিতরেও একটা অরণ্য আছে, তার ভিতরেও কেউ হারিয়ে যেতে পারে।” আমি হারিয়ে গেছি, তোমার ভিতরে নয়, বরং তোমার অনুপস্থিতির জঙ্গলে। সেই জঙ্গল থেকে আর ফেরা হয় না। আমি শুধু পথ খুঁজি, পথ পাই না।
এখন যখন বৃষ্টি নামে, তখন মনে হয়, প্রকৃতি হয়তো আমায় বিদ্রূপ করছে। এতকিছুর মাঝে তুমি নেই—এটাই যেন তার পরম অর্জন। আমি তাকিয়ে থাকি, কীভাবে আকাশ কাঁদে, কীভাবে পৃথিবী সেই কান্না গ্রহণ করে। আমি চাই, কেউ যেন আমার কান্নাও গ্রহণ করতো।
আমার কান্না প্রকাশ পায় না, আমি গলতে জানি না। আমি শুধু জমে যাই। আমার ভিতরে জমে আছে তোমার জন্য না বলা হাজারটা চিঠি, যেগুলোর কোনো ঠিকানা নেই। তুমি যে আমার ছিলে, সেই দাবিটুকুও আজ ভ্রান্ত বলে মনে হয়।
আজ তুমি অন্য কারো জীবনের গল্প, আমি কেবল অতীত। অথচ আমার কাছে তুমি এখনো বর্তমান—একটা জীবন্ত অনুভব। বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, তুমি ফিরে আসবে। তুমি জানো কি? আমি এখনো জানালার পাশে বসে থাকি, বৃষ্টির শব্দে তোমার পায়ের শব্দ মেলাতে চাই।
জীবন মানেই কি শুধু পাওয়া আর না-পাওয়ার হিসেব? যদি তাই হয়, তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় না-পাওয়া তুমি। আর সেই না-পাওয়ার গল্পই আমি প্রতিদিন লিখে যাচ্ছি—এই বৃষ্টির কালি দিয়ে।
তুমি না থাকলেও, তোমার উপমা আছো। তুমি আছো মেঘে, বাতাসে, বৃষ্টিতে, চায়ের কাপের ধোঁয়ায়, গানবাজনার অলস দুপুরে, নিস্তব্ধ রাতের জানালার পাশে। তুমি আছো প্রতিটি মুহূর্তে—যেখানে আমি একা।
আমি চাই, তুমি ভালো থাকো। আমি জানি, তুমি এই লেখা কখনো পড়বে না, তবুও লিখে চলি, ঠিক যেমন কেউ জানে না সে কেন কাঁদে, তবুও কাঁদে।
এই প্রবন্ধে আমি কোনো সমাপ্তি চাই না। কারণ, প্রেমের মতো ব্যথারও কোনো শেষ নেই। যেমন বৃষ্টিরও কোনো শুরু বা শেষ নেই—সে আসে, ভিজিয়ে দেয়, ধুয়ে নেয়, আর রেখে যায় কাদা। আমার জীবন এখন সেই কাদায় ভরা।
তুমি হয়তো ভেবেছিলে, চলে গেলে আমি ভুলে যাবো। কিন্তু প্রেম তো মনে রাখা নয়, প্রেম হলো—অদৃশ্য এক ক্ষত। সেটা নিয়ে মানুষ বাঁচে, হাসে, আবার বৃষ্টি নামলেই চুপ করে কাঁদে।
তোমাকে ভালোবাসি বলেই আজও কষ্ট পাই। তুমি না থাকলেও, বৃষ্টি আছে। আর এই বৃষ্টি মানেই তুমি।
তুমি যদি কখনো ফিরে আসো, যদি কখনো জানালার কাঁচে হাত রেখে ভাবো—আমার কথা, তখন হয়তো বৃষ্টি নামবে। আর সেই বৃষ্টিতে তুমি আমার উপস্থিতি অনুভব করবে—ঠিক যেমন আমি আজও প্রতিটি ফোঁটায় তোমাকে অনুভব করি।
সমাপ্তি নয়—একটি দীর্ঘ অপেক্ষার নতুন সূচনা
