কবি লিটন হোসাইন জিহাদ হলেন সেইসব বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যারা কেবল একটি ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। সাংবাদিক হিসেবে তার কলম সমাজের অসংগতি, বৈষম্য এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত গর্জে উঠেছে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথম আইপি টিভি ‘পথিকটিভি’-র প্রতিষ্ঠাতা, যার মাধ্যমে স্থানীয় সংবাদ এবং মানুষের কথা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরেছেন।
তার ভেতরের কবিসত্তা তুমিহীনা বন্ধ্যা সময় ‘সময় এখন জাগরণের’ এবং ‘আর্তুগালী’ বই উপহার দিয়েছে, যা তার মানবিক চিন্তাধারা এবং সংবেদনশীল মনের পরিচয় বহন করে। নিচে কবি লিটন হোসাইন জিহাদ এর কয়েকটি কবিতা দেওযা হলো।
রূপার প্রশ্ন ছিল— “তুমি কেন আমাকে ভালোবাসো?” আমি বলেছিলাম— “তোমার চোখে একফোঁটা বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে, সেটার জন্য। সেদিনই হারিয়ে গিয়েছিল সে—
তৃণা জানতে চেয়েছিল— “আমার কোনটা তোমায় টানে?” বলেছিলাম— “তোমার নীরবতা। কথা না বলেও পুরো পৃথিবীটা বলে ফেলো।” সে পরে এমন এক মানুষ খুঁজে পেয়েছিলো, যে প্রতিটি নীরবতা শব্দে ভরিয়ে রাখে।
স্নিগ্ধা বলেছিল— “আমার মধ্যে বিশেষ কী আছে?” আমি উত্তর দিয়েছিলাম— “তুমি যখন কাঁদো, পৃথিবীটা তখন প্রেমময় করুণ হয়ে ওঠে। সে হেসে উঠেছিল— যেন সত্যের ভেতরও সে মিথ্যের আশ্রয় খুঁজে পেতে চায়।
অর্চি বলেছিল— “আমি তোমাকে কেন বিশ্বাস করবো?” আমি বলেছিলাম— “কারণ আমি আয়না—যার প্রতিফলনে সত্যি দেখা যায়,। তখনই সে বুঝে নিয়েছিলো— আমি তার গন্তব্য নই।
মানুষ ভালোবাসে প্রশান্তি, আমি বলি প্রগাঢ় সত্য। তারা খোঁজে আশ্রয়, আমি দেখাই আয়না। তাই হয়তো সবাই চলে যায়— আমি থেকে যাই, ভালোবাসা নামের এক অনন্ত অনুশোচনার পাশে।
তারপর “তুমি কেমন আছো?” বলেছিলাম — প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাচ্ছি, আর জেগে উঠছি অন্য জীবনে।
“আকাশ এত রঙ বদলায় কেন?” বলেছিলাম — আকাশ রঙ বদলায় না, আমাদের মনই প্রতিদিন অন্য চোখে দেখে।
“ভালোবাসা কী?” বলেছিলাম — এটা আগুন, যা ঈশ্বর আমাদের ভেতরে জ্বালান, নিজেকে পুড়িয়ে খাটি করার জন্য।
“মৃত্যু ভয়ংকর?” বলেছিলাম — না, মৃত্যু কেবল দরজা, ওপাশে বসে আছে আমাদেরই অন্য রূপ।
“তুমি এত চুপ কেন?” বলেছিলাম — শব্দ যা বলতে জানে না, নীরবতা তা জানে।
প্রতিবার সত্যটাই বলতে চেয়েছি তাই মানুষ হাঁটলো পাশ কাটিয়ে, চলে যায়-
মানুষ নামের দীর্ঘ যাত্রা
ভোরের কুয়াশায় কেউ জিজ্ঞেস করলো— “কেন মানুষ একা হয়ে যায়?” বলেছিলাম— মানুষ শিখে গেছে শব্দ করতে, কিন্তু শিখেনি শোনা। সবাই কথা বলে, কেউ কারও নীরবতা বোঝে না।
“ভালোবাসা কেন টেকে না?” বলেছিলাম— আমরা ভালোবাসি মুহূর্তকে, মানুষকে নয়। যাকে আঁকড়ে ধরি, সে আসলে সময়ের ছায়া— ধরা দেয়, কিন্তু থাকে না।
“মানুষ কবে সুখী হয়?” বলেছিলাম— যখন কিছু হারানোর ভয় থাকে না, যখন প্রাপ্তি আর বঞ্চনা একই নদীর দুই তীর হয়ে যায়। সুখ তখনই আসে, যখন অন্তর শান্ত হয় নিজের সঙ্গেই।
“জীবনের মানে কী?” বলেছিলাম— জীবন মানে — পথের কাঁটা চিনেও ফুলকে ভালোবাসা। প্রতিদিন একটু করে হারানো, আর একটু করে পাওয়া। জীবন মানে ঈশ্বরের শেখানো এক সহ্য করার শিল্প—
“মানুষ হওয়া এত কঠিন কেন?” বলেছিলাম— মানুষ হতে হলে নিজেকে ভাঙতে হয়, অহংকারকে ছাই করতে হয়, অন্যের চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে হয়।
“তাহলে জীবনের স্বার্থকতা কোথায়?” বলেছিলাম— যখন তুমি দুঃখির মুখে হাসি আনো, যখন কারও অন্ধকারে নিঃশব্দে আলো রাখো, যখন চলে যাওয়া মানুষকে প্রার্থনায় রাখো — তখনই মানুষ হওয়া সফল হয়।
সব প্রশ্নের উত্তর বইয়ে নেই, প্রার্থনাতেও নয়। উত্তরগুলো লুকিয়ে আছে নদীর ঢেউয়ের নিঃশব্দ স্রোতে, বাতাসের নরম স্পর্শে, বৃষ্টির বিন্দুতে ভাঙা আলোতে।