বেলায়াত-এ-ফকিহের ধারক, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক হাতেই কাপিঁয়েছে বিশ্ব

লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ
প্রকাশ: ১ মাস আগে

লিটন হোসাইন জিহাদ: ১৯৩৯ সালের ইরানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে, পবিত্র নগরী মাশহাদ-এর এক সরল ঘরে জন্ম নিল যে শিশু, ইতিহাস তার নাম লিখে রেখেছে দৃঢ় অক্ষরে—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মীয় পণ্ডিত; সংসার ছিল অনাড়ম্বর, কিন্তু চিন্তার জগৎ ছিল বিস্তৃত। শৈশবেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জ্ঞানের পথ কেবল পাণ্ডিত্য নয়, দায়িত্বেরও পথ।

মাশহাদের মাদ্রাসা থেকে তাঁর যাত্রা গড়ায় শিয়াদের জ্ঞাননগরী কোম-এ। সেখানে তিনি কেবল ধর্মতত্ত্ব পড়েননি; তিনি সময়কে পড়েছেন, রাজনীতিকে পড়েছেন, এবং মানুষের মনস্তত্ত্বকে অনুধাবন করেছেন। ষাটের দশকে যখন শাহ শাসনের কঠোরতা জনমানসে ক্ষোভ জমাচ্ছিল, তখন তিনি দাঁড়ালেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-র স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আর তাঁর পথপ্রদর্শক ছিলেন বিপ্লবের প্রবাদপুরুষ রুহুল্লাহ খোমেনি।

কারাবরণ, নজরদারি, নির্যাতন—এসব তাঁর জন্য নতুন ছিল না। কিন্তু যে মানুষ বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে, তাকে শৃঙ্খল বেঁধে রাখা যায় না। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব যখন ইরানের আকাশে নতুন সূর্যোদয় আনল, তখন খামেনি ছিলেন সামনের সারির কর্মী। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের জটিল সময়ে তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন, প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করেন, এবং Islamic Revolutionary Guard Corps-কে সংগঠিত করার কাজে ভূমিকা রাখেন—যে বাহিনী পরে রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৮৯ সালে খোমেনির ইন্তেকালের পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। তখন অনেকেই সন্দিহান ছিলেন—এই নীরব, চিন্তাশীল আলেম কি বিশাল রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করতে পারবেন? সময় তার উত্তর দিয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় তিনি ইরানের নীতি, পররাষ্ট্রকৌশল, সামরিক অবস্থান ও আদর্শিক দিকনির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৮১ সালে তেহরানের এক মসজিদে ভাষণরত অবস্থায় ভয়াবহ বোমা হামলার শিকার হন তিনি। বিস্ফোরণে তাঁর ডান হাত স্থায়ীভাবে অচল হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা দীর্ঘ অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাত আর স্বাভাবিক হয়নি। তবুও রাজনৈতিক ময়দান থেকে তিনি সরে দাঁড়াননি। কিন্তু ইতিহাসে এমন বহু চরিত্র আছে, যাদের দেহ আঘাত পায়, মন পায় না। খামেনির ক্ষেত্রেও তাই। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি। বিস্ফোরণের পর যখন রেকর্ডারটি চেক করা হয়, তখন তার ভেতরে একটি ছোট চিরকুট পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল: “ফোরকান গ্রুপের পক্ষ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উপহার।” বোঝা গেল, টেপ রেকোর্ডারের ভেতরে ছিল শক্তিশালী বোমা। চিকিৎসকদের মতে, তিনি যে বেঁচে ফিরেছেন তা ছিল এক কথায় অলৌকিক।

খামেনি বিশ্বাস করতেন ‘বেলায়াত-এ-ফকিহ’ দর্শনে—যতদিন ইমাম মাহদীর প্রত্যাবর্তন না ঘটে, ততদিন একজন ন্যায়পরায়ণ ফকিহের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল না ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যম; ছিল এক ধর্মীয় দায়িত্বের ভার।

খামেনির ফতোয়ার মাধ্যমে সুন্নিদের অপমান করা হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি মনে করেন, শিয়াদের মধ্যে যারা সুন্নিদের আবেগ নিয়ে কটূক্তি করে, তারা আসলে ইসলামের শত্রু এবং ব্রিটিশ বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার চর।

অনেকের অজানা একটি দিক ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ। তিনি আরবি ও ফারসি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন, অনুবাদ করতেন। তাঁর রচিত “Palestine” গ্রন্থে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, কৌশলগত বিশ্লেষণে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে তিনি মানচিত্র, জনসংখ্যা ও শক্তির ভারসাম্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ সংঘাতের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।বইটি পড়লে ধারণা পাওয়া যায়, কতটা রণকৌশলী মস্তিষ্ক ছিল খামেনির।

তিনি বহুবার বলেছেন, বিজ্ঞান ও ইসলাম পরস্পরের শত্রু নয়। তাঁর আমলে ইরান স্টেম সেল গবেষণা, ন্যানোপ্রযুক্তি ও মহাকাশ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়ায়। সমর্থকেরা এটিকে দেখেন আত্মনির্ভরতার সংগ্রাম হিসেবে; সমালোচকেরা দেখেন ভূরাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল হিসেবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর নাম আলোচিত ছিল। Time এবং Forbes তাঁকে একাধিকবার বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান দিয়েছে। তাঁর এক বক্তব্য তেলের বাজারে আলোড়ন তুলতে পারত, তাঁর এক সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য নড়বড়ে করতে পারত।

খামেনির সমর্থকেরা তাঁকে দেখেন প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে; সমালোচকেরা দেখেন কঠোর রাষ্ট্রনেতা হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস যখন কোনো মানুষকে বিচার করে, তখন সে কেবল প্রশংসা বা নিন্দা দেখে না—দেখে প্রভাবের গভীরতা।

মাশহাদের সেই ধর্মীয় পণ্ডিতের  ঘর থেকে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল এমন এক আসনে, যেখান থেকে পুরো অঞ্চলকে প্রভাবিত করা যায়। এক হাতে অক্ষমতা, অন্য হাতে রাষ্ট্রের ভার—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই  তিনি এক হাতে বিশ্ব কাপিঁয়েছেন।

সময়ের স্রোত বয়ে যায়, নেতারা আসেন-যান। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় থেকে যায় সংগ্রাম, বিশ্বাস ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেমনই এক অধ্যায়—যাকে বোঝার জন্য কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যুগের ভেতরের অস্থিরতাকে বুঝে নেওয়া।

 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট