মো মনির হোসাইন: একটি শহরের ধমনী কেটে ফেললে তার বেঁচে থাকা যেমন অসম্ভব হয়ে পড়ে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অস্তিত্বও আজ ঠিক সেই সংকটের মুখে।
মানচিত্র ও সরকারি বিএস খতিয়ান স্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে—শুধু পৌর এলাকাতেই ৪৫টি এবং জেলাজুড়ে রয়েছে ৪৫৯টি খাল। অথচ বাস্তবে এই বিশাল প্রবাহের অধিকাংশই এখন ইতিহাস, অথবা ময়লার ভাগাড়।
তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমল কিংবা ৯০-এর দশক পর্যন্ত যে খালগুলোতে পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা চলত, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, ভরাট আর প্রভাবশালী দখলদারদের গ্রাসে তা আজ ড্রেনে রূপ নিয়েছে। কোথাও আবার ড্রেনের ওপর পাকা স্ল্যাব বসিয়ে পুরো খালকেই ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির মতো হজম করে ফেলা হয়েছে।
বারবার উদ্যোগ, সমীক্ষা আর অর্থ বরাদ্দের অংক বাড়লেও শহরের বুক চিরে থাকা ঐতিহাসিক টাউন খালসহ বেশিরভাগ খালের সুদিন ফেরেনি। কাড়ি কাড়ি টাকা জলে গেলেও শেষ পর্যন্ত বন্ধই রয়ে গেছে জলের গতি।
সম্প্রতি বিদায়ী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টাউন খালের মাত্র ৫০০ মিটার অংশ পরিষ্কার করে তিতাস নদী থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত সাময়িক পানি প্রবাহ ফেরানো সম্ভব হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
আট কিলোমিটারের এই খালের সিংহভাগই এখন দখলদারদের কব্জায়। একই অবস্থা পুরো শহরের। জেলা পরিষদ, স্টেশন রোড কিংবা শিমরাইলকান্দি পাওয়ার হাউজ রোডের যে খালগুলো প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট, সরজমিনে গিয়ে সেখানে খালের বিন্দুমাত্র চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন।
পৌরসভার পক্ষ থেকে ড্রেনে পরিণত হওয়া খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলো, স্থানীয় বাড়ির মালিকদের অবৈধ স্ল্যাব নির্মাণের কারণে ড্রেন পরিষ্কার পর্যন্ত করতে পারছেন না পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই মেড্ডা মার্কাস পাড়া, বিরাশার, ঈদগাহ্ মাঠ, মোড়াইল, কাজীপাড়া ও বণিকপাড়ার হাজার হাজার বাসিন্দা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন। নদী-খালের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া আজ কৃত্রিম এক বন্দিশালায় রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারি খাতায় ৪৫৯টি খালের তালিকা এবং সংস্কারের জন্য বিশাল বাজেটের খতিয়ান তৈরি হলেও বাস্তব পদক্ষেপে দৃশ্যমান পরিবর্তন সামান্যই। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, এলজিইডি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার বাস্তবায়নে জেলায় ২১টি খালের খননকাজ চলার দাবি করা হলেও শহরের মূল প্রাণকেন্দ্রের খালগুলো এখনো বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে।
সরকারি নথিতে ভাদুঘর মৌজাতেই ২৪টি খালের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় প্রতিনিধি ও বাসিন্দারা তা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করছেন। এতে পরিষ্কার হয়ে যায়, কাগজে-কলমে খালের সীমানা চিহ্নিত থাকলেও বাস্তবে সরকারি তদারকি ও উচ্ছেদ অভিযানের কোনো প্রভাব মাঠে নেই। জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার এই শিথিলতা আর সমন্বয়হীনতার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ নাগরিক।
উদ্ধার কার্যক্রম যদি কেবল নামকাওয়াস্তে পরিষ্কার অভিযান বা তালিকা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অচিরেই তিতাসের তীরের এই ঐতিহাসিক শহরটি সম্পূর্ণ পানিবন্দী হয়ে মানচিত্র থেকে তার অস্তিত্ব হারাবে।
এখনই সময়—অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে স্ল্যাবের আড়ালে ঢাকা পড়া খালগুলোকে মুক্ত করতে কঠোর ও সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।