— বিজ্ঞাপন —

ভাঙা হৃদয়ে বসন্তের আগমন

নিঃসঙ্গতারও যে নিজস্ব সংগীত আছে, তা এতদিন বুঝিনি। গভীর রাতে ঝিঁঝিঁ পোকারা যখন অন্ধকারের শরীরে সূক্ষ্ম সুরের নকশা আঁকে, আমি সেই শব্দের হাত ধরে চলে যাই অন্য এক পৃথিবীতে। সেখানে মানুষের মুখে মুখোশ নেই, প্রতিশ্রুতির আড়ালে ছুরি নেই, বিশ্বাসের শরীরে গোপন ক্ষত নেই। সেখানে ভালোবাসা কোনো কৌশল নয়, কোনো হিসাব নয়, কোনো অভিশাপও নয়।
43197
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

অনেক দিন পর আমার মনে হচ্ছে, আমি আবার বেঁচে উঠেছি। কেবল শ্বাস নেওয়ার অর্থে বেঁচে থাকা নয়, এ যেন মৃত্যুর দীর্ঘ অন্ধকার করিডর পেরিয়ে জীবনের আলোয় পুনর্জন্ম নেওয়া। মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া মানুষই সম্ভবত জানে, একটি স্বাভাবিক সকাল কতখানি আশীর্বাদ, বুকভরে নেওয়া একটি নিঃশ্বাস কতখানি ঐশ্বর্য, আর নির্ভার একটি রাতের ঘুম কত শত প্রার্থনার সমান।

একসময় সময় ছিল আমার সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষ। প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ হতো, প্রতিটি রাত যেন অনন্তকাল। নিজের ভেতরেই আমি ছিলাম আহত কোনো পাখি, যার ডানা আছে অথচ আকাশ নেই; উড়তে চায়, কিন্তু ক্ষতের যন্ত্রণায় বারবার মাটিতে আছড়ে পড়ে। বুকের ভেতর অদৃশ্য এক খাঁচায় সেই পাখিটি ছটফট করত। তার পালকে লেগে থাকত বিষণ্নতার ধুলো, চোখে জমে থাকত হারিয়ে যাওয়া আকাশের নীল।

এখন আমি প্রচুর সময়ের অধিকারী।

— বিজ্ঞাপন —

অদ্ভুত শোনালেও সত্য, সময় এখন আর আমাকে তাড়া করে না; আমিও সময়ের পেছনে রক্তাক্ত পায়ে ছুটি না। সময় এখন আমার পাশে বসে থাকা শান্ত সহচর। তার সঙ্গে আমার আর কোনো যুদ্ধ নেই। সন্ধ্যা এলে তাকে নিয়ে নিঃশব্দে বসি, রাত নামলে জোছনার দিকে তাকাই। মনে হয়, জীবনের সমস্ত ব্যর্থতার পরেও পৃথিবীতে কিছু আলো থেকে যায়, যার কোনো প্রতিদান দিতে হয় না।

এখন আমার ঘুম হয়।ট5।

সেই ঘুমের গায়ে জোছনা লেগে থাকে। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে যখন বিছানার এক কোণে নিঃশব্দে শুয়ে পড়ে, তখন আমার ঘুমের ভেতর অসংখ্য স্বপ্ন ভেসে ওঠে। যে স্বপ্নগুলো একদিন ভাঙা কাচের মতো বুকের ভেতর বিঁধে ছিল, আজ তারাই যেন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর প্রজাপতির মতো ডানা মেলে।

এখন আর একাকিত্ব আমাকে গ্রাস করে না।

নিঃসঙ্গতারও যে নিজস্ব সংগীত আছে, তা এতদিন বুঝিনি। গভীর রাতে ঝিঁঝিঁ পোকারা যখন অন্ধকারের শরীরে সূক্ষ্ম সুরের নকশা আঁকে, আমি সেই শব্দের হাত ধরে চলে যাই অন্য এক পৃথিবীতে। সেখানে মানুষের মুখে মুখোশ নেই, প্রতিশ্রুতির আড়ালে ছুরি নেই, বিশ্বাসের শরীরে গোপন ক্ষত নেই। সেখানে ভালোবাসা কোনো কৌশল নয়, কোনো হিসাব নয়, কোনো অভিশাপও নয়।

সে জগতে কেউ ভালোবাসার নাম করে কারও আত্মাকে হত্যা করে না।

একদিন আমি হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম।

হাসি যে মানুষের জন্মগত ভাষা, সেই ভাষাটিই যেন আমার স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটাকেও অপরিচিত মনে হতো। চোখের নিচে জমে থাকা ক্লান্তি, ঠোঁটের কোণে নির্বাসিত হাসি আর বুকের গভীরে নিরন্তর ভাঙনের শব্দ নিয়ে দিন কেটে যেত। মনে হতো, আমার বুকের মধ্যে বুঝি কোনো প্রাচীন প্রাসাদ ধসে পড়ছে। প্রতিদিন একটি করে দেয়াল ভাঙে, একটি করে জানালা খসে পড়ে, একটি করে স্বপ্ন ধুলোর নিচে চাপা পড়ে।

সেই ভাঙনের শব্দ কেউ শুনত না।

মানুষ বাইরে থেকে শুধু একজন মানুষকেই দেখে। অথচ তার ভেতরে কত শহর পুড়ে যায়, কত নদী শুকিয়ে যায়, কত সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তার সংবাদ পৃথিবীর কোনো সংবাদপত্রে ছাপা হয় না।

আমারও হয়নি।

কিন্তু মানুষের ভেতরের ঋতু চিরকাল এক থাকে না।

দীর্ঘ শীতেরও একদিন অবসান হয়। মৃতপ্রায় ডালের গায়ে হঠাৎ একটি সবুজ কুঁড়ি জন্ম নেয়। পরিত্যক্ত উঠোনে অকারণেই কোনো বুনো ফুল ফোটে। ঠিক তেমন করেই আমার বুকের সেই ধ্বংসস্তূপে একদিন বসন্ত এসেছে।

এখন সেখানে পাখিরা গান গায়।

যেখানে একসময় ভাঙনের শব্দ শুনতাম, সেখানে আজ অদৃশ্য ডানার ঝাপটানি শুনি। যে হৃদয়কে একদিন নিজের কাছেই বিরান ভূমি মনে হয়েছিল, সেখানে এখন কাশফুল দোলে, কৃষ্ণচূড়া জ্বলে, অচেনা পাখিরা এসে বাসা বাঁধে। আমি বুঝতে শিখেছি, হৃদয়ের সমস্ত দরজা একজন মানুষের জন্য খুলে রাখার নাম জীবন নয়। কখনো কখনো কিছু দরজা বন্ধ করাই নতুন জানালা খুঁজে পাওয়ার প্রথম শর্ত।

আমার অভিশপ্ত কবিতাগুলোরও এখন অন্য জীবন হয়েছে।

একসময় তারা ছিল আমার ক্ষতের সাক্ষী। প্রতিটি পঙ্‌ক্তির শরীরে লেগে থাকত কান্নার গন্ধ। শব্দগুলো যেন রক্তাক্ত পায়ে হাঁটত। ছন্দের আড়ালে জমে থাকত বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস। কবিতা লিখতে বসলে মনে হতো, নিজেরই কোনো ক্ষত থেকে অক্ষর তুলে কাগজে সাজিয়ে রাখছি।

আজ সেই কবিতারাই আশ্চর্য এক ছন্দে বিরহকে ডেকে নিয়েছে।

বিরহ এখন আর আমার শাস্তি নয়; সে আমার শিল্পের উপাদান। দুঃখ এখন আর আমাকে গ্রাস করে না; আমি তাকে শব্দে রূপান্তর করি। স্মৃতি আমাকে আর রক্তাক্ত করে না; আমি তাকে বাক্যের শরীরে বসিয়ে দিই। যে বিষ একদিন আমাকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল, সময়ের আশ্চর্য রসায়নে সেই বিষই আজ আমার কবিতার মধু হয়ে উঠেছে।

আর সেই শব্দেরা এখন তিতাসের জলে নৃত্য করে।

তিতাস আমার কাছে তখন কেবল নদী থাকে না। সে হয়ে ওঠে বিস্মৃতির প্রবাহ, মুক্তির উপাখ্যান। তার ঢেউয়ের সঙ্গে আমার পুরোনো কষ্টগুলো দূরে ভেসে যায়। জলের গায়ে চাঁদ ভাঙে, আবার জোড়া লাগে। সেই দৃশ্য আমাকে শেখায়, ভেঙে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। চাঁদ প্রতিটি ঢেউয়ে শত টুকরো হয়, অথচ আকাশের চাঁদ অক্ষত থাকে।

মানুষও বোধ হয় তেমন।

জীবনের ঢেউ তাকে বারবার ভাঙে, অথচ তার গভীরে কোথাও একটি পূর্ণ সত্তা থেকে যায়। আমরা কেবল সেই অক্ষত মানুষটিকে খুঁজে পেতে অনেক দেরি করে ফেলি।

আমি সেই মানুষটিকে আবার খুঁজে পেয়েছি।

যাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম কোনো এক অন্ধ বিশ্বাসের গলিতে, কোনো প্রতারণার অন্ধকারে, কোনো অসমাপ্ত সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপে। তাকে আমি আবার হাত ধরে তুলে এনেছি। তার শরীর থেকে ধুলো ঝেড়েছি, চোখের জল মুছে দিয়েছি, বলেছি, পৃথিবী এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

এখন আমি আর কারও ফিরে আসার শব্দের জন্য দরজায় কান পেতে থাকি না। কারও অনুপস্থিতিকে নিজের অস্তিত্বের অপূর্ণতা বলে মনে করি না। কারণ আমি জেনেছি, চলে যাওয়া মানুষের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য সব সময় আরেকজন মানুষের প্রয়োজন হয় না। কখনো সেই শূন্যতায় জন্ম নেয় আত্মমর্যাদা, কখনো শিল্প, কখনো নিঃসঙ্গতার সৌন্দর্য, কখনো নিজের সঙ্গে নিজের গভীর পরিচয়।

এ এক আশ্চর্য মুক্তি।

যে মানুষটি একসময় ভালোবাসার নামে পাওয়া আঘাতকে নিজের নিয়তি ভেবেছিল, আজ সে জানে, ভালোবাসা কখনো মানুষের আত্মমর্যাদা কেড়ে নেয় না। যে সম্পর্ক প্রতিনিয়ত মানুষকে ক্ষুদ্র করে, তাকে নিঃস্ব করে, তার হাসি কেড়ে নেয়, তার রাতের ঘুম হত্যা করে, তার নাম যা-ই হোক, অন্তত শান্তি নয়।

তাই আজ আমার কোনো অভিযোগ নেই।

যারা আমাকে ভেঙেছিল, তাদের প্রতিও নয়। কারণ তারা আমাকে ভাঙতে ভাঙতেই অজান্তে শিখিয়ে গেছে, নিজের ভাঙা টুকরোগুলো কীভাবে নিজেকেই কুড়িয়ে নিতে হয়। তারা চলে গিয়ে আমাকে শিখিয়েছে নিজের সঙ্গ। তারা অন্ধকার দিয়ে বুঝিয়েছে আলোর মূল্য। তারা বিষাদ দিয়ে চিনিয়েছে বসন্ত।

আজ তাই পেছনে তাকালে আমার আর ক্রোধ হয় না।

শুধু বিস্ময় হয়।

ভাবি, ওই মানুষটিই কি আমি ছিলাম, যে সামান্য একটি স্মৃতির আঘাতে সারারাত জেগে থাকত? ওই বুকটাই কি আমার ছিল, যেখানে সারাক্ষণ ধ্বংসের শব্দ হতো? ওই চোখই কি আমার, যেখানে একসময় ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিল না?

তারপর জানালার বাইরে তাকাই।

জোছনা নেমেছে।

ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে।

দূরে কোথাও হয়তো তিতাস বয়ে যাচ্ছে নিজের অনন্ত গন্তব্যের দিকে। তার জলে চাঁদের টুকরো ভাসছে, আর আমার পুরোনো কবিতাগুলো ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে। মনে হয়, শব্দেরা আজ আর কাঁদছে না। তারা নাচছে।

আমি তখন খুব ধীরে নিজের বুকের ওপর হাত রাখি।

কোনো ভাঙনের শব্দ শুনি না।

শুনি পাখির ডাক।

শুনি বসন্তের বাতাস।

শুনি বহুদিন মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের হৃদস্পন্দন।

এবং সমস্ত শব্দের ওপরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি গভীর, প্রশান্ত সত্য—

আমি এখন সুস্থ মানুষ।
আমি আবার বেঁচে উঠেছি।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ০

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার ↗ PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ ↗ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী ↗ PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ ↗