উত্তপ্ত
মহাসড়কে এক মায়ের দৌড়,
আর সন্তানের জন্য একটি পৃথিবী বাঁচিয়ে রাখার আকুতিকিছু ছবি থাকে, যেগুলো দেখার জন্য চোখের প্রয়োজন হয় না, হৃদয়ই
যথেষ্ট। কিছু দৃশ্য থাকে, যেগুলো কোনো ভাষ্য ছাড়াই মানুষের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। এই ছবিটিও তেমন।
এখানে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নেই, নেই কোনো বক্তৃতা, নেই ক্ষমতার দম্ভ কিংবা বিজয়ের উল্লাস। আছে একজন মা, তাঁর পিঠে ঝোলানো একটি ব্যাগ, বুকে জড়িয়ে রাখা একটি শিশু এবং পেছনে ফেলে আসা এক অস্থির পৃথিবী।
মহাসড়ক
উত্তপ্ত। চারপাশে সংঘাত, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা। কোথাও শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কোথাও ধাওয়া–পাল্টাধাওয়া, কোথাও মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। জীবিকার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। সেই উত্তাল জনপদের বুক চিরে একজন মা ছুটে চলেছেন।
তাঁর কোলে সন্তান। শিশুটির হাত মায়ের গলা জড়িয়ে আছে। মায়ের একটি হাত সন্তানের মাথায়, অন্য হাত দিয়ে আগলে রেখেছেন তার ছোট্ট শরীরটিকে। যেন পৃথিবীর সমস্ত বিপদকে নিজের শরীরে ঠেকিয়ে তিনি সন্তানটিকে নিরাপদে নিয়ে যেতে চান।
একবার
ছবিটির দিকে তাকান। তারপর নিজের মায়ের মুখটি মনে করুন।মায়ের দৌড়ের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি কেবল একটি রাস্তা পার হচ্ছেন না, পার হচ্ছেন জীবনের অসংখ্য দুর্যোগ। তাঁর পায়ের নিচে ধুলোমাখা মহাসড়ক, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অনিশ্চয়তা, অথচ তাঁর সমস্ত মনোযোগ একটি ছোট্ট শিশুর নিরাপত্তায়। হয়তো শিশুটি জানেও না, তার চারপাশে কী ঘটছে। সে
জানে শুধু মায়ের বুকের উষ্ণতা, মায়ের গায়ের পরিচিত গন্ধ, মায়ের হাতের কোমল স্পর্শ। পৃথিবী তার কাছে তখনো নিষ্পাপ। কিন্তু সেই নিষ্পাপ পৃথিবীটুকু রক্ষা করতে একজন মাকে কী অসম্ভব কঠিন
বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ছুটতে হচ্ছে!
এই
মায়ের পিঠে একটি ব্যাগ। হয়তো সেটি সন্তানের স্কুলব্যাগ। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, তার বই–খাতা, স্বপ্ন
আর সম্ভাবনার প্রতীক। অথচ কী নির্মম বৈপরীত্য!
যে মহাসড়ক দিয়ে একটি শিশুর স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেই মহাসড়কই কোনো একদিন তার মায়ের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে। যে সমাজে শিশুর
হাতে থাকার কথা বই, সেখানে তার মায়ের বুকের ভেতর জমা হয় নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘশ্বাস।
একটি
মায়ের কাছে সন্তান শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়; সন্তান তাঁর অস্তিত্বের সম্প্রসারণ। নিজের ক্ষুধাকে উপেক্ষা করে যে নারী সন্তানের
মুখে খাবার তুলে দেন, নিজের শরীরের ক্লান্তিকে অস্বীকার করে যে নারী সন্তানের
অসুখের রাতে জেগে থাকেন, নিজের স্বপ্নগুলোকে নিঃশব্দে ভাঁজ করে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখেন, তিনিই মা। তাঁর জীবনের অভিধানে ‘ত্যাগ‘ শব্দটির কোনো আলাদা সংজ্ঞা নেই। কারণ ত্যাগ তাঁর কাছে কোনো উপলক্ষ নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপন।
বাংলাদেশের
শ্রমজীবী মায়েদের জীবন যেন এক দীর্ঘ অপ্রকাশিত
উপন্যাস। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁদের দিন শুরু হয়। ঘরের চুলায় আগুন জ্বালানো, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি, তারপর নিজের কর্মস্থলের উদ্দেশে ছুটে যাওয়া। কেউ পোশাক কারখানায়, কেউ ইটভাটায়, কেউ অন্যের বাড়িতে, কেউ বাজারে কিংবা পথে–ঘাটে শ্রম বিক্রি করেন। দিনশেষে তাঁদের হাতে যে মজুরি আসে,
তার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে থাকে তাঁদের অবিরাম শ্রম, যা কোনো হিসাবের
খাতায় লেখা থাকে না।
কত
মা আছেন, যাঁরা কারখানার মেশিনের শব্দের ভেতরেও সন্তানের কান্না শুনতে পান। কত মা আছেন,
যাঁরা নিজের শরীরের ব্যথা লুকিয়ে সন্তানের জন্য হাসেন। কত মা আছেন,
যাঁরা মাসের শেষ দিনটিতে নিজের জন্য কিছু না কিনে সন্তানের
স্কুলের বেতন পরিশোধ করেন। তাঁদের কাছে ঈদ মানে নিজের
নতুন পোশাক নয়, সন্তানের গায়ে নতুন জামা। তাঁদের কাছে আনন্দ মানে দামি কোনো উপহার নয়, সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি।
অথচ
এই মায়েদের জীবন কতটা অনিরাপদ! কর্মস্থলে তাঁদের নিরাপত্তা কতটুকু? তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্য কতটুকু? অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ানোর মতো ব্যবস্থা কতটুকু? কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে তাঁদের নিরাপত্তা কতটুকু? যে নারী দেশের
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিজের ঘাম ঝরান, তাঁর সন্তানের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?
এই
ছবির মাকে দেখে মনে হয়, তাঁর হয়তো কোনো অভিযোগ জানানোর অবকাশ নেই। তাঁর হয়তো সময় নেই রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাওয়ার। তিনি জানেন, সন্তানকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে হবে। তাঁর সন্তান ভয় পেলে তাকে
শান্ত করতে হবে। চারপাশের পৃথিবী যতই নিষ্ঠুর হোক, সন্তানের কাছে তাঁকে আশ্রয় হয়েই থাকতে হবে।
কিন্তু
প্রশ্ন হলো, একজন মাকে কেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে? কেন একটি শিশুকে মহাসড়কের আতঙ্কের মধ্যে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে? কেন একজন নারীকে জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে
সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বিগ্ন থাকতে হবে?
শ্রমিকের
ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন অন্যায় নয়। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি কোনো অপরাধ হতে পারে না। আবার আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষের জীবন, চলাচল ও নিরাপত্তা বিপন্ন
হওয়াও কাম্য নয়। শ্রমিকের দাবি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। কারণ সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক
সময় দিতে হয় সেই মানুষগুলোকে,
যাঁদের হাতে ক্ষমতা নেই, যাঁদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, যাঁদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনই লড়াই করতে হয়।
এই
ছবির মা তাঁদেরই একজন।
হয়তো
তাঁরও কিছু দাবি ছিল। হয়তো তিনিও কোনো কর্মস্থলে কাজ করেন। হয়তো তিনিও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সংসারের অভাব কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর
কাছে কোনো দাবি, কোনো আন্দোলন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বড় নয়। বড়
শুধু তাঁর সন্তান। নিজের জীবন নিয়ে তিনি হয়তো অনেক কিছু ভাবতে পারেন, কিন্তু সন্তানের নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চান না।
মায়ের
ভালোবাসার সবচেয়ে আশ্চর্য দিক এখানেই। তিনি নিজে কতটা বিপদের মধ্যে আছেন, সেটি ভাবার সময়ও তাঁর নেই। সন্তানের মাথায় আঘাত লাগতে পারে কি না, সে
ভয়েই তাঁর হাত শিশুটির মাথা আগলে রাখে। তিনি নিজে পড়ে গেলে কী হবে, সে
চিন্তা তাঁর নেই; সন্তানটি যেন পড়ে না যায়, সেটিই
তাঁর একমাত্র প্রার্থনা।
মা
আসলে এমনই। পৃথিবীর সব মানুষ যখন
নিজের নিরাপত্তা খোঁজে, মা তখন সন্তানের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের নিরাপত্তা বিসর্জন দেন। পৃথিবীর সব মানুষ যখন
আশ্রয় খোঁজে, মা তখন নিজের
বুকটিকেই সন্তানের জন্য আশ্রয় বানিয়ে ফেলেন।
একটি
শিশু যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, মা তখন তার
হাত ধরে রাখেন। যখন সে পড়ে যায়,
মা তাকে তুলে নেন। যখন সে অন্ধকারে ভয়
পায়, মা আলো জ্বালিয়ে
দেন। আর যখন পৃথিবীটাই
তার কাছে ভয়ংকর হয়ে ওঠে, মা তাকে বুকে
জড়িয়ে বলেন, ‘ভয় পেয়ো না,
আমি আছি।‘
কিন্তু
মায়ের এই ‘আমি আছি‘ কথাটির পেছনে কত অসহায়ত্ব, কত
অশ্রু, কত নির্ঘুম রাত
জমা থাকে, তা সন্তান বড়
হওয়ার আগে বুঝতে পারে না।
যে
সন্তান একদিন মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে, সে বড় হয়ে
হয়তো নিজের কর্মব্যস্ততায় মাকে সময় দিতে ভুলে যায়। যে মা নিজের
শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তাকে বড় করেছেন, সেই
মায়ের হাত একদিন কাঁপতে শুরু করলে সন্তান হয়তো দূর থেকে খবর নেয়। অথচ একদিন এই মায়ের হাতই
ছিল তার পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দেয়াল। একদিন এই বুকই ছিল
তার সমস্ত ভয়, কান্না ও অস্থিরতার শেষ
ঠিকানা।
আমরা
প্রায়ই মাকে নিয়ে কবিতা লিখি, গান গাই, আবেগঘন বক্তব্য দিই। কিন্তু মায়ের শ্রমের মূল্য দিতে কতটা প্রস্তুত আমরা? মায়ের বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা সচেতন? তাঁর নিরাপত্তা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে কতটা দায়িত্বশীল?
যে সমাজ একজন মায়ের শ্রমকে সম্মান করতে জানে না, যে রাষ্ট্র শ্রমজীবী
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, যে বাস্তবতায় একটি
শিশুকে তার মায়ের বুকে আতঙ্ক নিয়ে পথ চলতে হয়,
সেই সমাজকে নিজের মানবিকতার আয়নায় একবার তাকানো প্রয়োজন।
এই
ছবিটির দিকে ফিরে তাকালে বুকের ভেতর কেমন যেন একটি দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতা, অর্থনীতি আর উন্নয়নের হিসাবের
বাইরে একটি ছোট্ট সত্য আছে—একজন মা তাঁর সন্তানকে
নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখতে চান।
তাঁর
খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই। তিনি চান, সন্তানের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ থাকুক। তার মুখে দুবেলা খাবার উঠুক। সে নির্ভয়ে স্কুলে
যাক। রাস্তায় বের হলে আতঙ্কে মায়ের বুক কেঁপে না উঠুক। সে
বড় হোক একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক পৃথিবীতে।
একজন
মায়ের কাছে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
হয়তো
এই শিশুটি একদিন বড় হবে। স্কুলব্যাগের
পরিবর্তে তার কাঁধে থাকবে জীবনের দায়িত্ব। সে হয়তো কোনো
একদিন এই ছবির কথা
জানবে। জানবে, তার শৈশবের কোনো এক অনিশ্চিত মুহূর্তে
তার মা তাকে বুকে
জড়িয়ে মহাসড়ক পেরিয়ে ছুটেছিলেন। তখন হয়তো সে বুঝবে, মায়ের
সেই দৌড় শুধু কয়েক গজ রাস্তা অতিক্রম
করার দৌড় ছিল না; সেটি ছিল সন্তানের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছিনিয়ে আনার এক নিরন্তর সংগ্রাম।
আর
যদি কোনোদিন সে মায়ের সেই
ছুটে চলার স্মৃতি মনে করে, তবে যেন মায়ের পায়ের ধুলো মুছে দিতে পারে। যেন মায়ের ক্লান্ত হাত দুটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলতে পারে, ‘মা, এবার তুমি বিশ্রাম নাও। এত দিন তুমি
আমাকে আগলে রেখেছ, এবার তোমাকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার।‘
কারণ
পৃথিবীর সব পথ একদিন
শেষ হয়ে যায়, সব আন্দোলন থেমে
যায়, সব সংঘাতের উত্তাপ
একসময় নিভে আসে। কিন্তু সন্তানের জন্য মায়ের যে ভালোবাসা, তার
কোনো সমাপ্তি নেই।
মায়ের
কোল কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো সাময়িক আশ্রয় নয়। এটি মানুষের জীবনের প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম পৃথিবী, প্রথম ভালোবাসা।
রাষ্ট্রের
কাছে হয়তো এই নারী একজন
সাধারণ মানুষ। অর্থনীতির কাছে তিনি একজন শ্রমজীবী নারী। পরিসংখ্যানের কাছে তিনি একটি সংখ্যা। কিন্তু তাঁর সন্তানের কাছে তিনি গোটা পৃথিবী।
আর
পৃথিবী যতই উত্তপ্ত হোক, যতই নিষ্ঠুর হোক, একটি শিশু যেন তার মায়ের বুকে মাথা রেখে অন্তত এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে
বাঁচতে পারে—পৃথিবীতে এখনো নিরাপদ একটি জায়গা আছে। সেটি তার মায়ের কোল। সেই কোলটুকু নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।