রাজশাহীতে হামের ভয়াবহ থাবা: এক মাসে ১২ শিশুর মৃত্যু, আইসিইউ সংকটে উদ্বেগ
রাজশাহী অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চলতি মার্চ মাসে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার শিশুর মধ্যে তিনজন মারা যায়, যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বর্তমানে বেঁচে থাকা শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে গত শনিবার বিকেলে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আইসিইউ সংকটের কারণে অনেক রোগী সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য সূত্র জানায়, মার্চ মাসজুড়ে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত ১২ শিশুর মধ্যে ৯ জন আইসিইউতে নেওয়ার পর মারা গেছে। বাকি তিনজন আইসিইউতে নেওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করে।
হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহী, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। অত্যন্ত সংক্রামক এ রোগের বিস্তার রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী মেডিকেলে হাম আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া মার্চের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৮৪ জন আক্রান্ত শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
এদিকে শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল পর্যন্ত পাবনায় ২৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যদিও সেখানে এখনো কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত হয়ে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালের শিশু বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, শনিবার সকাল পর্যন্ত ৭০ শিশু ভর্তি থাকলেও বিকেলে ২০ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
নিহত শিশুদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, সময়মতো আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশু হিয়ার পিতা রিফাত হোসেন জানান, বহু চেষ্টা করেও আইসিইউ না পেয়ে তার সন্তানকে হারাতে হয়েছে। অপরদিকে, জান্নাতুল মাওয়ার পিতা হৃদয় বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তার মেয়েকে আইসিইউতে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তবে আশপাশের শিশুদের মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে হাসপাতালের মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জনবল সংকট থাকায় রোগীদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। শনিবার থেকে হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন কর্নার হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সরেজমিনে তার বাস্তবতা পুরোপুরি মিলেনি।
এদিকে একই ওয়ার্ডে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখার কারণে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। এক অভিভাবক জানান, ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার শিশুও হাম আক্রান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
