সত্যের কফিনে দেশ: এক পরাবাস্তব আত্মবিলাপ

সত্যের কফিনে দেশ: এক পরাবাস্তব আত্মবিলাপ
সত্যের কফিনে দেশ: এক পরাবাস্তব আত্মবিলাপ
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

লিটন হোসাইন জিহাদ: জীবিত থাকা অবস্থায়ও আমি প্রতিদিন মৃতদের ভিড়ে হাঁটছি। বাতাসে নীতির নয়, মিথ্যার গন্ধ। সত্য মরে গেছে—ধীরে, তীব্রভাবে, এক নির্বাক হত্যার মতো। আমরা যারা এখনো বুক ফুলিয়ে মানুষ বলি নিজেদের, তারা কেবল মৃত শরীরের ভেতর গুঁজে রাখা একটু নিঃশ্বাসমাত্র।

আগে ভাবতাম, শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে। আজ বুঝেছি—শিক্ষিতরাই সভ্যতার সবচেয়ে নিখুঁত অপরাধী। তারা বই পড়েছে নৈতিকতার জন্য নয়, শোষণের ব্যাকরণ শেখার জন্য। তারা রাষ্ট্রের আইন জানে, কিন্তু তা প্রয়োগ করে নিজেদের সুবিধামতো। তারা মানুষ নয়, সিস্টেমের চালক—একটি অদৃশ্য যন্ত্রের ঠান্ডা রোবট, যার হৃদয়ে মানবতা নেই, আছে কেবল  ক্ষমতা,যৌনতা আর টাকার লোভ।

দেশের প্রতিটি অফিস, আদালত, দল, সংগঠন—সব এক জাহাজে ভাসছে, যার নাম ক্ষমতা, যৌনতা টাকা। এই তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে আজকের সভ্যতার মন্দির। এখানে পবিত্রতার সংজ্ঞা বদলে গেছে, সততা এখন এক প্রকার বোকামি।

খেটে খাওয়া, সাধারণ মানুষ যারা আগেও রক্ত দিয়েছে, তারা আজও রক্ত দিচ্ছে—তফাৎ শুধু এতটুকু, তখন দিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য, এখন দিচ্ছে প্রভুদের বিলাসিতার জন্য।
৫২-তে ভাষা হারানোর ভয় ছিল, ৭১-এ স্বাধীনতার, আর ২৪-এ হারাচ্ছি বিবেক। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি এক অদৃশ্য গণকবরে—যেখানে দাফন হয়েছে মানুষের, বেঁচে আছে কেবল তাদের মুখোশ।

রাজনীতি এক প্রকার শিল্প—দখল আর প্রতিস্থাপনের শিল্প। এক দল যায়, অন্য দল আসে, আর লাল রঙে ভিজে থাকে পথের ধুলো। জনগণ সেখানে কেবল দৃশ্যপট, একবার হাততালি দেয়, একবার মরে যায়।

আমি কোনো দলের নই, কোনো মতের নই। আমি কেবল এক অপাঙ্ক্তেয় মানুষ, যে দেখে চারপাশের সাজানো মৃত্যুকে, আর ভাবে—এই দেশে আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি? আমার অস্তিত্ব এক পরিহাস, যেখানে বেঁচে থাকাও এক ধরনের মৃত্যুদণ্ড।

আজ নীতির বই পড়ে না কেউ, পড়ে টেন্ডারের দরপত্র। নিয়ম এখন কাগজে থাকে, বাস্তবে তার স্থান টাকার টেবিলে। ন্যায়বিচার এখন হুইলচেয়ারে বসে আছে, তার চোখে কালো কাপড় বাঁধা, কিন্তু কান খোলা—যেখানে টাকা ফিসফিস করে।

দেশপ্রেম ,বক্তৃতার শব্দ, বাস্তবে এক অলংকারিক মিথ্যা। আমলা থেকে রাজনীতিবিদ—সবাই এক অদৃশ্য লুটের বাহিনী, যারা রাষ্ট্র নামের নৌকাটাকে নিজের দিকেই টানে। কেউ বলে উন্নয়ন, কেউ বলে প্রগতি—কিন্তু সবকিছুই শেষ পর্যন্ত গিলে নেয় সেই একই পেট: ক্ষমতার পেট

আমি প্রতিবাদ করতে চাই, কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর এখন শূন্যের প্রতিধ্বনি।
আমার ভাষা গলায় আটকে থাকা একটা দমবন্ধ চিৎকার।
তবুও লিখি—কারণ লেখা এখন একমাত্র বেঁচে থাকার প্রমাণ।

এই লেখা আমার আত্মবিলাপ নয় শুধু, এ এক মৃত সভ্যতার ডায়েরি। আমি জানি, এই শব্দগুলো কোনো পরিবর্তন আনবে না, কিন্তু ইতিহাস একদিন এই অক্ষরগুলো পড়বে, আর বলবে—
এক সময় কেউ ছিল, যে দেখেছিল সত্যের মৃত্যু, আর মিথ্যার উৎসবে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল একা।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ