অনলাইন প্রতারণায় সাইবার অপরাধীরা ইদানীং মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে ভুয়া ওয়েবসাইট ও লিঙ্ক তৈরি করছে। দেখতে অবিকল আসল ওয়েবসাইটের মতো মনে হলেও সামান্য তফাত রাখা হয় ইউআরএল (URL) বা ওয়েব ঠিকানায়। যেমন— ইংরেজি ‘c’ বর্ণের স্থানে সিরিলিক বর্ণমালার ‘с’ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ভুয়া লিঙ্ক। কোনো সাধারণ বার্তা বা ইমেইল সতর্কতার সঙ্গে পড়ার পরও এসব সূক্ষ্ম জালিয়াতি ধরা সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের জালিয়াতিকে বলা হয় ‘হোমোগ্লিফ অ্যাটাক’ (Homoglyph Attack)। একটি হরফ অন্য একটি হরফের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যাওয়ার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা বিভিন্ন বর্ণমালা থেকে একই রকম দেখতে অক্ষর বেছে নেয়। এর মাধ্যমে এমন ইমেইল ঠিকানা বা ওয়েবসাইট ইউআরএল তৈরি করা হয়, যা দেখে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সেটিকে আসল বলে মনে করেন এবং বিভ্রান্ত হয়ে লিঙ্কে ক্লিক করেন। লিঙ্কে ক্লিক করার পর ব্যবহারকারীকে একটি ভুয়া বা স্পুফ ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর তথ্য চুরি করা হয়।
অক্ষর ও চিহ্নের এই বিভ্রান্তি তৈরিতে অপরাধীরা হরেক রকমের কৌশল অবলম্বন করছে। গত বছর সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান, বুকিং ডটকমের (Booking.com) মতো ভুয়া ঠিকানা তৈরির ক্ষেত্রে অপরাধীরা ইংরেজি স্ল্যাশ (/) চিহ্নের বদলে জাপানি হিরাগানা চরিত্র ‘ん’ ব্যবহার করেছিল। এর ফলে সাধারণ চোখে বিষয়টি ধরা পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইসেটের (ESET) গ্লোবাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার জেক মুর জানান, প্রতারকরা মাইক্রোসফটের (Microsoft) মতো পরিচিত করপোরেট পরিচয় নকল করতে খুব পছন্দ করে। তারা ল্যাটিন ‘c’ এর পরিবর্তে সিরিলিক ‘с’ ব্যবহার করে মাইক্রোসফটের ভুয়া লিঙ্ক তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করে। জেক মুর আরও জানান, বর্তমানে বেশিরভাগ ফিশিং আক্রমণেই অ্যাটাচমেন্ট ফাইল ডাউনলোডের বদলে সরাসরি লিঙ্কে ক্লিক করানোর ফাঁদ পাতা হয়। ক্ষতিকারক অ্যাটাচমেন্টগুলো সিকিউরিটি সফটওয়্যার সহজেই ধরে ফেলে, তাই অপরাধীরা কৌশল বদলে এমন লিঙ্ক বানায় যা প্রথম দেখায় নিরাপদ মনে হয়।
সাইবার নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম নর্ডভিপিএনের (NordVPN) প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মারিজুস ব্রিডিস বলেন, হোমোগ্লিফ অ্যাটাক মূলত কারিগরি কৌশলের চেয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। ইমেইল বা মেসেজের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মনে ভয় বা জরুরি পরিস্থিতির আতঙ্ক তৈরি করা হয়, যাতে তারা দ্রুত সাড়া দেন এবং ইউআরএলটি ভালোভাবে যাচাই করার সময় না পান। তড়িঘড়ির মুহূর্তে মানুষের মস্তিষ্ক যা আশা করে, সেটাই দেখে নেয়। ফলে কয়েক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্তই সাইবার নিরাপত্তার বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
বিভিন্ন ধরনের ফন্ট বা লেখার ফন্ট ব্যবহারে এই জালিয়াতি চেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন ‘কমিক সান্স গিল’ ফন্টে সিরিলিক ‘a’ ও ইংরেজি ‘a’-এর পার্থক্য ধরা প্রায় অসম্ভব। সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞরা এতদিন ধরে ব্যবহারকারীদের যেকোনো ওয়েবসাইট বিশ্বাস করার আগে যাচাই করার পরামর্শ দিয়ে এসেছেন, তবে হোমোগ্লিফ অ্যাটাকের ফলে সঠিক নিয়ম মেনে দেখার পরও ব্যবহারকারীরা প্রতারিত হতে পারেন।
যদি কোনো লিঙ্কে ক্লিক করা হয়, তবে সেটি সাধারণত এমন একটি ভুয়া পেজে নিয়ে যায় যেখানে আসল ওয়েবসাইটের ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড এমনকি ওয়ান-টাইম পাসকোড (OTP) প্রবেশ করাতে বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো ইমেইল, এসএমএস বা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার লিঙ্কে সরাসরি ক্লিক না করে, কাঙ্ক্ষিত আসল ওয়েবসাইটে আলাদাভাবে নতুন ট্যাব খুলে ভিজিট করা উচিত। ইমেইল পাঠানোর ক্ষেত্রেও লিঙ্কে ক্লিক না করে পরিচিত ইমেইল ঠিকানাটি সরাসরি টাইপ করে নেওয়া নিরাপদ।
নিরাপদ থাকতে নিজের ব্যবহৃত ওয়েব ব্রাউজার সর্বদা আপডেট রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক ব্রাউজারগুলো নতুন ধরনের সন্দেহজনক ওয়েবসাইটগুলো চিহ্নিত করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (MFA) চালু রাখা জরুরি। কোনো কারণে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি বা ফাঁস হয়েছে বলে মনে হলে অবিলম্বে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং দ্রুত প্রতারণার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা উচিত।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।