সামরিক গবেষক ও হ্যাকারদের যৌথ উদ্যোগে যেভাবে গড়ে উঠল ‘টর প্রজেক্ট’

ডিজিটাল দুনিয়ায় নজরদারি থেকে গোপনীয়তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে টর প্রজেক্ট। মার্কিন সামরিক গবেষক ও সাইফারপাঙ্ক হ্যাকারদের এক অনন্য মেলবন্ধনে জন্ম নেওয়া এই প্রযুক্তির পেছনের ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
সামরিক গবেষক ও হ্যাকারদের যৌথ উদ্যোগে যেভাবে গড়ে উঠল ‘টর প্রজেক্ট’
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

প্রযুক্তি ডেস্ক: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ন

প্রযুক্তির বিশ্বে বর্তমানে ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটের সূচনা হয়েছিল উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের বার্তা নিয়ে হলেও সেখানে রয়েছে নজরদারির বড় ছায়া। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক গবেষক এবং হ্যাকারদের এক অভূতপূর্ব জোটের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে ‘টর’ (দ্য অনিয়ন রাউটিং) প্রজেক্ট। বর্তমানে এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে মানুষের ডিজিটাল স্বাধীনতা ও অনলাইনে পরিচয় গোপন রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

টর সাধারণত ‘ডার্ক ওয়েব’ বা ‘ডার্ক নেট’ হিসেবে পরিচিত হলেও এর মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মার্কিন সরকারের অনুদানে। এটি মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল অবকাঠামো, যা ব্যবহারকারীর অনলাইন পরিচয় গোপন রাখতে সাহায্য করে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সার্ভারের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। টর প্রজেক্টের ওয়েবসাইট থেকে এর ব্রাউজার বিনামূল্যে ডাউনলোড করা সম্ভব। এটি ব্যবহারের সময় ইন্টারনেট সিগন্যাল এনক্রিপ্ট হয়ে বিভিন্ন সার্ভার ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছায়, যার ফলে কোনো সরকারের পক্ষে ব্যবহারকারীর অনলাইন কার্যক্রম ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধ থেকে বাঁচতে ভিপিএন এবং এনক্রিপ্টেড মেসেঞ্জারের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে মেটাডেটা ও নজরদারি নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয়তা রক্ষার প্রযুক্তির দ্বন্দ্ব লেগেই রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্য অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। মূলত প্রযুক্তিগত ত্রুটি, কর্পোরেট লোভ, সামাজিক কারণ এবং উগ্র মানসিকতার দরুণ ইন্টারনেটে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে।

টর নেটওয়ার্কের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের সূচনালগ্নে সাইফারপাঙ্ক নামে পরিচিত হ্যাকার ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা সামরিক এনক্রিপশন সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এনক্রিপশন না থাকলে ইন্টারনেট স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরকারের ধারণা ছিল, সীমানাহীন বাজারে অবাধ তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিজয়ী হবে। এই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিযুক্ত পরিবেশেই জন্ম নেয় ডার্ক ওয়েবের মূল প্রযুক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির একটি সাধারণ কম্পিউটার ল্যাবে ডেভিড গোল্ডশ্লাগ, মাইক রিড এবং পল সাইভারসন নামের তিন গবেষকের হাতে টরের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের পরিবর্ধন সামরিক বাহিনীর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ইন্টারনেটের রাউটিং সিস্টেমে মেটাডেটা ব্যবহারের ওপর যে নির্ভরতা ছিল, তা চিঠির খামের ওপর প্রাপক ও প্রেরকের ঠিকানার মতো কাজ করত। ফলে আইএসপি বা অবকাঠামো পরিচালনাকারীরা সিআইএ কিংবা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টদের অবস্থান সহজেই শনাক্ত করতে পারত।

এই নিরাপত্তা ঘাটতি ও মেটাডেটা ঝুঁকি থেকে সামরিক যোগাযোগকে রক্ষা করতে গবেষকেরা উদ্ভাবন করেন ‘অনিয়ন রাউটিং’ বা পিঁয়াজের খোসার মতো স্তরীভূত রাউটিং ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে ট্রাফিকের রাউটিং তথ্য তিনটি স্তরের এনক্রিপশনে লুকিয়ে রাখা হয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন রাউটার বা রিলে সার্ভারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক বাউন্স করে পাঠানো হয়। প্রতিটি সার্ভার একটি করে এনক্রিপশন স্তর খোলে এবং পরবর্তী সার্ভারের ঠিকানা জানতে পারে। এর ফলে কোনো একক সার্ভারের পক্ষে ডেটার উৎস এবং গন্তব্য একসংগে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না।

তবে এই গোপনীয়তার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে নেটওয়ার্কটিতে প্রচুর সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। সেই তাগিদ থেকেই সামরিক গবেষকেরা হ্যাকারদের সংগে জোট বাঁধেন। ১৯৯৭ সালে ওকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘ইনফরমেশন হাইডিং’ কর্মশালায় মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকেরা হ্যাকারদের সংগে এক আলোচনা সভায় অংশ নেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় নামহীন বা অ্যানোনিমাস ডিজিটাল নিরাপত্তার নতুন রূপ। পরবর্তীতে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, হ্যাকার এবং সামরিক বাহিনী—সবাই এই এক প্রযুক্তির ছাতার নিচে চলে আসে।

বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোর যুগে টরের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং স্বাধীন বাকস্বাধীনতা রক্ষায় টর প্রজেক্ট এক অনন্য আশার আলো হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

অথেন্টিক সোর্স: প্রথম আলো
মূল প্রতিবেদনের লিংক সংরক্ষিত। তথ্যটি AI দিয়ে সম্পাদিত/অনূদিত; মূল সূত্র যাচাই করতে উপরের লিংক ব্যবহার করুন।
পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ