আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ন
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ তলানিতে ঠেকেছিল। এবার লোহিত সাগর ও আরব সাগরকে যুক্ত করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ বাব আল–মানদেব প্রণালিও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে হুতিরা। ইয়েমেন সরকারের সূত্রে জানা গেছে, বাব আল–মানদেব প্রণালিতে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। পাশাপাশি ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখাও তাদের দখলে চলে গেছে। এর ফলে বাব আল–মানদেব প্রণালি–সংলগ্ন পুরো ইয়েমেন উপকূলই এখন হুতি বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কৌশলগত এই সাফল্যের পর লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাবে গত তিন দশকের মধ্যে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে গত বৃহস্পতিবার ড্রোন হামলা চালানো হয়। পূর্বের শিল্পনগরী আবকাইক থেকে পশ্চিমের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরকে যুক্ত করা এই পাইপলাইনটি থেকে স্যাটেলাইট চিত্রে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিকল্প হিসেবে রিয়াদ দিনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইন দিয়ে পাঠাচ্ছিল, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশ। হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সৌদি সরকার জানিয়েছে, হামলাটি ইরাকের এমন একটি অঞ্চল থেকে চালানো হয়েছে যা ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হামলায় কয়েকজন আহতও হয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই পাইপলাইন হামলায় ইরানের হাত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে বাগদাদের অনুরোধে সৌদি আরব আপাতত কোনো পাল্টা সামরিক হামলায় না গিয়ে ইরাক সরকারের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতাকে সমর্থনের নীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বাগদাদ ইরানের সঙ্গে শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে।
সৌদি বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হওয়া এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ। এর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হলেও বর্তমানে সেখান দিয়ে দিনে গড়ে মাত্র ১৪টি জাহাজ চলাচল করছে। এর প্রভাবে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্যালনে ৬ ডলার অতিক্রম করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাব আল-মানদেব বন্ধ হলে বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল হাওয়া হয়ে যাবে, যার চড়া মূল্য পুরো বিশ্বকে দিতে হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে সরাসরি অংশ নেবে না, তবে কেবল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রিয়াদকে সহায়তা করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও প্রকাশ করেন যে হুতিদের পক্ষ থেকেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
মার্কিন সরাসরি সহায়তা না পাওয়ার পর ইয়েমেনের সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের ওপর নতুন করে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল–নাজিলি জানিয়েছেন, মোখা বন্দরের কাছে হুতিদের যানবাহন ও অস্ত্র লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে তা ধ্বংস করা হয়েছে এবং এতে কয়েকজন হুতি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
সামরিক সংঘাত ও লড়াই তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনে মানবিক সংকট এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগে থেকেই সেখানে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত ছিলেন। নতুন করে আরও প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন, যার একটি বড় অংশ তাইজ এলাকায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, প্রায় ৫০০ বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনি লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। জিবুতির উপকূল থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছেন।
মূল প্রতিবেদনের লিংক সংরক্ষিত। তথ্যটি AI দিয়ে সম্পাদিত/অনূদিত; মূল সূত্র যাচাই করতে উপরের লিংক ব্যবহার করুন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।