নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা বনাম সাংবাদিকের কলম

লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ
প্রকাশ: ১৩ ঘন্টা আগে

৩ মে, বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস। দিনটি কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্যের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়; তবে সেই স্তম্ভ যদি নড়বড়ে হয়, তবে পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোই অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

ইউনেস্কোর উদ্যোগে পালিত এই দিবসটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারকে পুনরুজ্জীবিত করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য সামাজিক দায়বদ্ধতা। একই সঙ্গে এটি সেই সব কলমযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, যারা সত্যের সন্ধানে গিয়ে নিপীড়ন, হুমকি কিংবা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবারের দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য-উপাত্ত সাংবাদিকতার এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। যদিও গত বছরের তুলনায় রাজনৈতিক পরিবেশে সামান্য উন্নয়নের ইঙ্গিত রয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ, আইনি কাঠামোর জটিলতা এবং সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সূচকে অবনতি ঘটেছে।

তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উত্তরসূরি ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫’ নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব আইনের প্রয়োগ সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি করেছে, যা মুক্ত সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বর্তমানে এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানি হামলার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপর স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক চক্রের চাপ বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলার ঘটনা পেশাদার সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করেছে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মালিকানা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এর ফলে ‘সম্পাদকীয় স্বাধীনতা’ শব্দবন্ধটি অনেক ক্ষেত্রে আলীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে কাটছাঁট করা হয়, যার ফলে জনস্বার্থ ও বস্তুনিষ্ঠতা গৌণ হয়ে পড়ে। কর্পোরেট চাপের মুখে সত্য অনেক সময় ‘অর্ধসত্যে’ রূপান্তরিত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্যের (Misinformation) প্লাবনের মাঝে মূলধারার সাংবাদিকতা আজ এক কঠিন পরীক্ষা দিচ্ছে। ‘ক্লিকবেট’ বা সস্তা জনপ্রিয়তার নেশা এবং দ্রুত সংবাদ প্রকাশের চাপে তথ্যের গভীরতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ম্লান হয়ে পড়ছে। ফলে পাঠকের মধ্যে সাংবাদিকতার প্রতি এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট কাটাতে হলে সাংবাদিকতাকে আরও স্বচ্ছ, যাচাইভিত্তিক ও দায়বদ্ধ হতে হবে।

রাজধানীর চাকচিক্যময় স্টুডিওর বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের জীবন অতি কষ্টে কাটে। স্বল্প বেতন, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা এবং পেশাগত সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও তারাই স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধান কণ্ঠস্বর। তাদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা না গেলে সাংবাদিকতার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হওয়া কঠিন।

বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা দিবস বাংলাদেশের জন্য একটি দর্পণের মতো, যেখানে আমাদের অর্জন ও বিচ্যুতি একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়। মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গুরুভার দায়িত্ব। স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়; বরং ভয় ও মোহের ঊর্ধ্বে থেকে সত্যকে নির্ভীকভাবে উপস্থাপন করা।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক, যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ ও মালিকপক্ষ সাংবাদিকের কলমকে বাধা দেবে না; বরং ভয়নয়, ‘সত্য হবে আগামীর প্রধান চালিকাশক্তি

 

  • নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা বনাম সাংবাদিকের কলম