অর্থনীতি ডেস্ক: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:২১ অপরাহ্ন
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঁচামালের সঠিক মূল্য সংযোজন এবং প্রান্তিক কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘স্টার অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ’। দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং পেশা ছেড়ে ২০২০ সালে সৈয়দ আমিনুল কবির সরাসরি কৃষিশিল্পে যুক্ত হয়ে মৌলভীবাজারে এই উদ্যোগ গড়ে তোলেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রক্রিয়াজাত আদা, রসুন ও পেঁয়াজের গুঁড়া উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় করপোরেট বাজারের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমাদের দেশে রান্নাবান্নায় ঐতিহ্যগতভাবে কাঁচা বা বাটা মসলা ব্যবহার করা হলেও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশনের গুঁড়া বা পাউডার মসলার চাহিদা রয়েছে। মাংসের মসলা, বিরিয়ানি মসলা, চানাচুর ও চিপসের মতো খাবারের একই স্বাদ ও মান ধরে রাখতে বিশ্বমানের কাঁচামাল প্রয়োজন হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২০২১ সালের শেষের দিকে স্টার অ্যাগ্রো বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
আদা, রসুন ও পেঁয়াজ বাতাসের আর্দ্রতা দ্রুত শুষে নেয়। ফলে শুকানো, আর্দ্রতা বজায় রাখা, পেষাই ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান বজায় রাখা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। নিজস্ব প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করে তারা করপোরেট ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ। এর মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের সরাসরি যুক্ত করে প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী ফসল ফলানো ও সংগ্রহের কৌশল শেখানো হচ্ছে। ফলে কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করার ‘ট্রেসিবিলিটি’ সহজ হচ্ছে। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপযুক্ত সাদা পেঁয়াজ চাষ না হওয়ায় তা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এছাড়া ভোজ্যতেল ও প্রসাধনীর জন্য ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ভালো মানের কোপরা আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি ভার্জিন ও আরবিডি কোকোনাট অয়েল প্রস্তুত করছে।
স্টার অ্যাগ্রোর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আমিনুল কবির জানান, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বখ্যাত জাপানি বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘আজিনোমোটো’র সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা এবং কারিগরি প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির ফুডসেফটি, ট্রেসিবিলিটি ও ডকুমেন্টেশন-সংক্রান্ত শর্ত পূরণের মাধ্যমে তাদের উৎপাদনব্যবস্থা বিশ্বমানের হয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আইএসও ২২০০০:২০১৮ এবং হালাল সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা বাড়লেও স্থানীয় পর্যায়ে পরিকাঠামোগত সমস্যায় পড়ছে কারখানাটি। মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর জরাজীর্ণ সড়কের কারণে বিদেশি ক্রেতারা সন্তুষ্ট হয়েও রপ্তানি আদেশ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। শিল্পনগরীতে গ্যাস সংযোগ না থাকায় এলপিজি ব্যবহার করতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বাড়ছে এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে সংকট কাটাতে নিজস্ব উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে কারখানা সচল রাখা হচ্ছে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও লাইসেন্স নবায়নে প্রশাসনিক ধীরগতিও তাদের বাধাগ্রস্ত করছে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছে স্টার অ্যাগ্রো। দেশীয় আদা ও রসুনকে কেবল কাঁচা বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্য সংযোজন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এতে আমদানি নির্ভরতা কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত হবে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।