মেয়েশিশুর শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা, বৈষম্য ও বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা নিয়ে প্রতিবছর আসে মীনা দিবস। ২৪ সেপ্টেম্বর দিবসটি ঘিরে নানা আয়োজনও হয়। কিন্তু আয়োজন শেষ হওয়ার পর প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশের মেয়েশিশুদের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা বদলেছে?
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর চূড়ান্ত তথ্য বলছে, অগ্রগতি হয়েছে, তবে মেয়েশিশু ও কিশোরীদের জন্য বাল্যবিয়ে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও সহিংসতার মতো ঝুঁকি এখনও বড়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত MICS 2025 দেশের শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী ও পরিবারের পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপগুলোর একটি। এতে ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ২০১৯ সালের MICS-এ এই হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরে হার কমেছে, কিন্তু এখনও প্রায় প্রতি দুই তরুণীর একজনের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই জরিপে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮.৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত।
১৮ বছরের আগে বিয়ের পাশাপাশি ১৫ বছরের আগেই বিয়ের হারও MICS 2025-এ ১৩.৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ১৫.৫ শতাংশ।
ইউনিসেফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া, অল্প বয়সে সন্তান ধারণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঘরের ভেতর সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি দেখা যায়।
MICS 2025-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সমন্বয়কৃত নেট উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ, নিম্ন মাধ্যমিকে ৬০.১ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০.৮ শতাংশ। আর শিক্ষা সম্পন্ন করার হার প্রাথমিকে ৮৩.৭ শতাংশ, নিম্ন মাধ্যমিকে ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ।
ইউনিসেফ বলছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
শিক্ষায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি শেখার মানও গুরুত্বপূর্ণ। MICS 2025 অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে।
মেয়েশিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় শিশুশ্রমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। MICS 2025 অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। ইউনিসেফের হিসাবে, এই বৃদ্ধির অর্থ হলো ২০১৯ সালের তুলনায় ১২ লাখের বেশি অতিরিক্ত শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত হয়েছে।
শিশুশ্রম শুধু আয়-রোজগারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; দীর্ঘ সময় কাজ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং বিদ্যালয় থেকে দূরে থাকার কারণে এর প্রভাব শিশুদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সুযোগের ওপরও পড়ে। বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক চাপকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শিশুদের নিরাপত্তার চিত্রও উদ্বেগের। MICS 2025 অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ গত এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। অর্থাৎ কিছুটা কমলেও ঘরের ভেতর সহিংস শাসনের ব্যাপকতা এখনও অনেক বেশি।
বাল্যবিয়ের পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক রীতি, নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ, শিক্ষার সুযোগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—বিভিন্ন কারণ কাজ করে। MICS 2025-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত।
ফলে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধ করার পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া এবং কিশোরীদের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ দিতে সরকার ও ইউনিসেফ SKILFO (Skills-Focused Literacy for Out-of-School Adolescents) কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে।
২০২৫ সালের জুনে ইউনিসেফ জানায়, কক্সবাজারে প্রায় ৭ হাজার কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে পরিচালিত পাইলটের পর কর্মসূচিটি ১৬ জেলায় এক লাখের বেশি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ও NEET কিশোর-কিশোরীর কাছে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতার পাশাপাশি কারিগরি, ডিজিটাল ও আর্থিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরবর্তীতে প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কক্সবাজারের SKILFO পাইলটে ৬,৮২৫ জন কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়, যাদের ৬০ শতাংশ ছিল মেয়ে। কর্মসূচিতে সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতার পাশাপাশি ১৩টি ট্রেডে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মীনা দিবসের মূল বার্তা শিক্ষা, সমতা, নিরাপত্তা ও শিশুর অধিকার। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের সর্বশেষ তথ্য দেখাচ্ছে, এসব লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতি হলেও বড় ধরনের ঘাটতি এখনও রয়েছে।
১৮ বছরের আগে বিয়ে কমেছে, কিন্তু হার এখনও ৪৭.২ শতাংশ। শিশুশ্রমের হার ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.২ শতাংশ হয়েছে। আর ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জরিপে এসেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ শিশু।
তাই মীনা দিবসকে শুধু একটি দিনের সচেতনতামূলক আয়োজন হিসেবে দেখলে এই সমস্যাগুলোর কাঠামোগত দিকগুলো আড়ালে থেকে যায়। মেয়েশিশুর জন্য নিরাপদ বিদ্যালয়, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, শিশুশ্রম কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সহিংসতামুক্ত পরিবেশ—সবগুলো ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
মীনা দিবস শেষ হয়েছে ২৪ সেপ্টেম্বর। কিন্তু MICS 2025-এর পরিসংখ্যান বলছে, মেয়েশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার কাজ এখনও অনেক বাকি।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।