জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মামলার রায় ঘোষণার জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করা হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অপর ছয় আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই মামলাটির সব আসামি পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি ‘কাউন্ট’ বা ধারা আনা হয়েছে। প্রথম কাউন্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ফোন করে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দেন তিনি। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার উসকানিমূলক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা এবং ১৫ জুলাই ধানমন্ডির সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ মর্মে বক্তব্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব নির্দেশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন।
একই কাউন্টে উল্লেখ করা হয়, ১৬ জুলাই তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলককে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ এবং সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশনা দেন কাদের। পরবর্তীতে চট্টগ্রামে ও রংপুরে আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন।
দ্বিতীয় কাউন্টে বলা হয়, ১৭ ও ১৮ জুলাই আন্দোলন প্রতিরোধে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। ১৯ জুলাই গণভবনে বৈঠক শেষে তিনি ‘শুটিং অ্যাট সাইট’ বা देखামাত্র গুলির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ নির্দেশনার পর ১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে মিরপুর ও মহাখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য আন্দোলনকারী নিহত হন। তিন নম্বর কাউন্টে বলা হয়, ৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশের পর ৪ ও ৫ আগস্ট মিরপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও রাজশাহীসহ সারা দেশে বহু আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৫ জুলাই ও ৩ আগস্ট ধানমন্ডির সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে প্ররোচনা ও সমর্থন জুগিয়েছেন তিনি। এছাড়া ৪ আগস্ট ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনকারীদের স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। তাঁর এসব প্ররোচনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মাদারীপুর, বাংলামোটর, পল্টন ও চাঁনখারপুলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন। নিজ জেলা মাদারীপুরেও তিনি সাবেক মেয়রের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে তদারকি করেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ে এবং ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে প্ররোচনা দিয়েছিলেন তিনি। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং ১৯ জুলাই প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ও হুমকি দেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা মহাখালীসহ আশপাশের এলাকায় ১৯ জুলাই ৬ জন আন্দোলনকারী নিহতের ঘটনায় তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধান ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এছাড়া ২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ইতিমধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ঘোষিত হতে যাওয়া মামলাটি গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনার সপ্তম রায় হতে যাচ্ছে।
মূল প্রতিবেদনের লিংক সংরক্ষিত। তথ্যটি AI দিয়ে সম্পাদিত/অনূদিত; মূল সূত্র যাচাই করতে উপরের লিংক ব্যবহার করুন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।